অনলাইন ডেক্স: বাংলাদেশে শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ভয়াবহ
আকার ধারণ করেছে। একের পর এক ধর্ষণ, হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে সমাজজুড়ে।
নিষ্পাপ শিশুদের ওপর এমন নির্মমতা শুধু বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, এটি দেশের সামাজিক ও মানবিক
সংকটের গভীর চিত্র তুলে ধরছে। সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঘটে
যাওয়া কয়েকটি ঘটনা মানুষকে নাড়িয়ে দিয়েছে। ঢাকার পল্লবীতে সাত বছরের শিশু রামিসা
আক্তারকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা করা হয়। অভিযোগ উঠেছে, পাশের ফ্ল্যাটে থাকা এক
দম্পতি এই নৃশংস ঘটনার সঙ্গে জড়িত। একইভাবে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে এক শিশুকে ধর্ষণের
চেষ্টা করে হত্যা করতে গিয়ে পাহাড়ি খাদে ফেলে যায় প্রতিবেশী এক ব্যক্তি। পরে হাসপাতালে
চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিশুটির মৃত্যু হয়। রাজধানীর বাড্ডায় তিন বছরের শিশু হাবিবকে হত্যা
করেন তার নিজের বাবা। মাদক কেনার টাকা না পেয়ে স্ত্রীর সামনেই সন্তানকে গলা টিপে হত্যা
করা হয়। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গত
১৬ মাসে দেশে অন্তত ৫২২ শিশু হত্যার শিকার হয়েছে। একই সময়ে ধর্ষণ ও বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের
শিকার হয়েছে এক হাজারের বেশি শিশু। বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদকাসক্তি, পারিবারিক অস্থিরতা,
সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং সহিংস মানসিকতা এসব ঘটনার পেছনে
বড় কারণ হিসেবে কাজ করছে। সমাজবিজ্ঞানী ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন,
পরিবারে নজরদারির অভাব এবং শিশুদের নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতার ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও
ভয়াবহ করে তুলছে। অনেক সময় শিশুরা পরিচিত মানুষের দ্বারাই নির্যাতনের শিকার হচ্ছে।
পারিবারিক কলহ, প্রতিশোধ, লোভ কিংবা অপরাধ আড়াল করতে শিশুদের টার্গেট করা হচ্ছে। এমনকি
বাবা-মাও কখনো কখনো নিজেদের সন্তান হত্যার মতো ভয়ংকর অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন। মাদকের বিস্তার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে
তুলেছে। মাদকাসক্ত ব্যক্তিরা নিজের পরিবার, প্রতিবেশী এমনকি শিশুদেরও নিরাপত্তাহীন
করে তুলছে। কোথাও ছিনতাইয়ের সময় শিশু হত্যা, কোথাও ধর্ষণের পর হত্যা, আবার কোথাও অপহরণ
করে মুক্তিপণ আদায়ের চেষ্টা—এসব অপরাধে মাদকের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু আইন প্রণয়ন
করলেই হবে না, আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। শিশু নির্যাতনের ঘটনায় দ্রুত
বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি অপরাধ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি
পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ এবং রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। শিশুদের নিরাপত্তা,
মানসিক স্বাস্থ্য এবং নৈতিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব বাড়ানোর তাগিদও দিয়েছেন তারা। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, যৌন সহিংসতা ও নির্যাতনের
শিকার শিশুরা দীর্ঘমেয়াদে ভয়, উদ্বেগ, মানসিক আঘাত ও মানুষের প্রতি আস্থাহীনতায় ভোগে।
তাই শুধু অপরাধীর শাস্তিই নয়, ভুক্তভোগী শিশুদের মানসিক পুনর্বাসনও অত্যন্ত জরুরি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, শিশু নির্যাতনের
ঘটনাগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সচেতনতা বাড়াতে কমিউনিটি পুলিশিং
ও সামাজিক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে না তুললে
কেবল আইন প্রয়োগ করে এ সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। শিশুরা সমাজের সবচেয়ে অসহায় ও নির্ভরশীল
অংশ। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু পরিবারের নয়, পুরো সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
নিষ্ঠুরতা ও সহিংসতার এই চক্র ভাঙতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more