অনলাইন ডেস্ক:
বিস্ময় ও নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়ে মাত্র তিন বছর তিন মাস দায়িত্ব পালনের পর শেষ হলো সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের বিতর্কিত অধ্যায়। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে যখন তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল তাঁকে দেশের রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করে, তখন দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন তো বটেই, খোদ দলটির জ্যেষ্ঠ নেতারাও চরম বিস্মিত হয়েছিলেন। কারণ সম্ভাব্য প্রার্থীদের দৌড়ে তাঁর নাম কারও দূরতম কল্পনায়ও ছিল না। গুঞ্জন রয়েছে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর ছোট বোন শেখ রেহেনার একক সিদ্ধান্তে তাঁকে এই পদে বসানো হয় এবং সংসদের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই তিনি সে বছরের ২৪ এপ্রিল বঙ্গভবনের মসনদে আসীন হন।
তবে তাঁর এই পুরো রাষ্ট্রপতিকাল শুরু থেকেই আইনি ও নৈতিক প্রশ্নের মুখে পড়েছিল। পেশাগত জীবনের শুরু থেকেই তাঁর বিভিন্ন কর্মকাণ্ড বারবার বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় তাঁর ভূমিকা নিয়ে তীব্র সমালোচনা রয়েছে। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে দুদকের এক তথ্যে প্রকাশ পায় যে, ২০১২ সালে বহুল আলোচিত পদ্মা সেতু প্রকল্পের পরামর্শক নিয়োগে দুর্নীতির প্রাথমিক প্রমাণ মিললেও তৎকালীন চেয়ারম্যান এম বদিউজ্জামান ও কমিশনার সাহাবুদ্দিন মিলে সেই মামলাটি ধামাচাপা দিয়েছিলেন। এ ছাড়া ২০১৫ সালে প্রায় দুই হাজার ৩৭ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারির ৫৬টি মামলা করা হলেও, মূল ব্যাংকের পর্ষদ বা তৎকালীন চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চুকে আসামির বাইরে রেখে দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে তদন্তে বেরিয়ে আসে যে, ঊর্ধ্বতন মহলের প্রচণ্ড চাপের কারণেই মূল অপরাধীদের ছাড় দিতে বাধ্য হয়েছিল দুদক।
দুদকের চাকরি থেকে বিদায় নেওয়ার পর সাহাবুদ্দিন জড়িয়ে পড়েন বিতর্কিত শিল্পগোষ্ঠী এস আলমের সঙ্গে। ২০১৭ সালে এস আলম গ্রুপ ইসলামী ব্যাংক দখল করার পর তিনি ব্যাংকটির স্বতন্ত্র পরিচালক ও ভাইস পরবর্তীতে ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। একই সঙ্গে তারা নিয়ন্ত্রিত এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকেরও উপদেষ্টা ছিলেন। ২০২৩ সালে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন পাওয়ার প্রাক্কালে তিনি এসব পদ থেকে পদত্যাগ করেন। কিন্তু পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাটের তথ্য প্রকাশ্যে এলে, এস আলমের পর্ষদে তাঁর দীর্ঘ উপস্থিতি তীব্র সমালোচনার ঝড় তোলে এবং সমালোচকেরা তাঁকে ‘এস আলমের প্রতিনিধি’ হিসেবে আখ্যায়িত করতে শুরু করেন। পাশাপাশি, দুদক আইনের ৯ ধারা অনুযায়ী কমিশনের সাবেক কমিশনাররা প্রজাতন্ত্রের কোনো লাভজনক পদে বসার অযোগ্য হওয়ায় তাঁর রাষ্ট্রপতি পদের আইনগত বৈধতা নিয়েও আদালতে প্রশ্ন উঠেছিল।
সবশেষ, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ঐতিহাসিক গণ–অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর মো. সাহাবুদ্দিনের ভূমিকা এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগপত্র নিয়ে তাঁর পরস্পরবিরোধী ও রহস্যজনক বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও বেশি ঘোলাটে করে তোলে। আইনি বৈধতার প্রশ্ন, দুর্নীতি দমন কমিশনে দায়িত্ব পালনের সময়কার বিতর্ক এবং এস আলম গ্রুপের সঙ্গে তাঁর সংশ্লিষ্টতার মতো নানা বিষয় তাঁর পুরো কার্যকালকে প্রশ্নবিদ্ধ করে রেখেছিল। শেষ পর্যন্ত নানা নাটকীয়তা ও সমালোচনার মধ্য দিয়েই সমাপ্তি ঘটল তাঁর বিতর্কিত রাষ্ট্রপতিকালের।
তথ্য: প্রথম আলো/ বিডিফেস
মেহেদী হাসান