প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: জুন ২৫, ২০২৬, ১০:৪০ এ.এম
মানবতার আড়ালে মাদার তেরেসা
অ-অ+
ডকুমেন্টারি—‘হেলস অ্যাঞ্জেল'
৮ নভেম্বর, ১৯৯৪। ইংল্যান্ডের চ্যানেল ফোর-এ প্রচারিত হয় এক বিশেষ ডকুমেন্টারি। ক্রিস্টোফার হিচেনসের উপস্থাপনায় ২৪ মিনিটের ওই ডকুমেন্টারি প্রচারের পরেই বিশ্বের নানা প্রান্তে বিতর্কের ঝড় ওঠে। চোখ কপালে তুলে ফেলেন অনেকেই। আর ফেলবেনই বা কেন? এতকাল মিডিয়া যা দেখিয়ে এসেছে, বই-পুস্তকে যা পড়ানো হয়েছে, তার অনেক কিছুই ওলটপালট করে দিল ওই এক ডকুমেন্টারি। কী ছিল সেই ডকুমেন্টারিতে? আর কেনই বা এত হইচই?
মাদার তেরেসা—এ নামটি শোনেননি এমন লোক খুঁজে পাওয়া খুব একটা সোজা কাজ হবে না নিশ্চয়ই। নামটি শুনলেই আমাদের মানসপটে ভেসে ওঠে ধবধবে সাদা শাড়ি পরিহিত এক বৃদ্ধার মুখচ্ছবি, যার সারাটা জীবন কেটেছে আর্তমানবতার সেবায়। অসুস্থ-জরাগ্রস্ত লোকদের জন্য চিকিৎসালয় প্রতিষ্ঠা, অভুক্তদের জন্য ভোজনালয় স্থাপন, অনাথ শিশুদের জন্য আশ্রম বানানো, স্কুল প্রতিষ্ঠা—কী করেননি তিনি! তাঁর এতশত কাজের জন্য তিনি বাহবা কুড়িয়েছেন তামাম দুনিয়ায়, পেয়েছেন শান্তিতে নোবেল পুরস্কার। হ্যাঁ, সারাটা জীবন মাদার তেরেসার সম্পর্কে মোটামুটি এগুলোই শুনে এসেছেন নিশ্চয়ই। এসবই শোনানো হয়েছে আমাদের, আর তা শুনে শ্রদ্ধায় অবনত হয়েছি আমরা। এ পর্যন্ত সব ঠিকঠাকই ছিল, কিন্তু গোলমালটা পাকালো ওই ডকুমেন্টারিটাই।
আসুন, ডকুমেন্টারির গল্পে যাওয়ার আগে মাদার তেরেসার জীবনীর ওপর কিঞ্চিৎ আলোকপাত করে আসি। ১৯১০ সালে আলবেনিয়ায় জন্ম। ১৮ বছর বয়সে খ্রিস্টধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে ভারতে আসেন তিনি। ১৯৯৭ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এখানেই ছিলেন তিনি। ১৯৫০ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন তাঁর দাতব্য সংস্থা 'মিশনারিজ অফ চ্যারিটি'। তাঁর প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসালয়, আশ্রম, স্কুল এই সংস্থার অধীনেই পরিচালিত হতো।
এই মিশনারিজ অফ চ্যারিটির সাথে কাজ করার সুযোগ হয়েছিল একজন ভলেন্টিয়ার ডাক্তারের, যার নাম ডক্টর অরূপ চ্যাটার্জি। কলকাতা মেডিকেল কলেজে পড়ার সময় এক বামপন্থী রাজনৈতিক দলের দারিদ্র্য নির্মূল অভিযানে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন তিনি। পরবর্তীতে একটি হাসপাতালে গরিব ও দুস্থদের সেবা দিতে শুরু করেন। ১৯৭১ সালে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন অনেক অসুস্থ বা আহত শরণার্থীর চিকিৎসাও এই হাসপাতালেই করেছেন তিনি। এসব সেবামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সময় অনেক নিপীড়িত, হতদরিদ্র মানুষের দ্বারে ঘুরতে হয়েছে তাঁকে। একসময় তিনি লক্ষ্য করেন, মাদার তেরেসার প্রতিষ্ঠিত মিশনারির কোনো স্বেচ্ছাসেবককেই এসব অবহেলিত মানুষের দ্বারে দেখা যায় না। এ থেকে তাঁর মনে কৌতূহল জেগে ওঠে এবং নিজ উদ্যোগেই শুরু করেন অনুসন্ধান। আর অনুসন্ধানে তিনি যা দেখতে পান, তা না কোনো নিউজ মিডিয়ায় আসত, না কোনো বই-পুস্তকে লেখা থাকত। তবে তখন কাউকেই তেমন কিছু জানাননি তিনি।
১৯৮৫ সালে ইংল্যান্ডে চলে যান আমাদের ডাক্তার সাহেব। সেখানে গিয়ে তিনি দেখতে পান চারদিকে মাদার তেরেসা আর তাঁর মিশনারির জয়জয়কার। এসব দেখে তিনি মনে মনে কিছুটা ক্ষুব্ধ হন এবং এখনই সিদ্ধান্ত নেন যা যা সরজমিনে দেখে এসেছেন তা বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরবেন; মিশনারিজ অফ চ্যারিটির মুখোশের আড়ালের রূপটা সবার সামনে উন্মোচন করবেন। সে অনুযায়ী ১৯৯৩ সালে তিনি ‘বান্দুং প্রোডাকশন’-এর সহকারী প্রডিউসার ভানিয়া ডেল বার্গোর কাছে একটা শর্ট ডকুমেন্টারি বানানোর প্রস্তাব পাঠান। ডেল বার্গো প্রস্তাবটি নিয়ে চ্যানেল ফোর-এর কাছে গেলে তারা এ নিয়ে কাজ করতে আগ্রহ প্রকাশ করে এবং লেখক-সাংবাদিক ক্রিস্টোফার হিচেনসকে ডকুমেন্টারিটির স্ক্রিপ্ট লেখা ও উপস্থাপনার দায়িত্ব দেয়। ১৯৯৪ সালে প্রচারিত হওয়া এই ডকুমেন্টারিতেই উঠে আসে মিশনারিজ অফ চ্যারিটির নানা অনিয়ম ও চরম অব্যবস্থাপনার চিত্র। কেমন অব্যবস্থাপনা ছিল সেখানে?
প্রশিক্ষণহীন চিকিৎসা: মাদার তেরেসার প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসালয়গুলোতে যারা সেবা দিত, তাদের কোনো স্বীকৃত মেডিকেল প্রশিক্ষণ ছিল না। কোনো প্রকার প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান ছাড়া শুধুমাত্র পূর্ব অভিজ্ঞতা আর স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতেই সেখানে চলত চিকিৎসা। এমনকি কোনো ডাক্তার সেখানে স্বেচ্ছায় সেবা দিতে এলে, সে আসলে ডাক্তার কি না বা তার কোয়ালিফিকেশন কী—এগুলো পর্যন্ত যাচাই করা হতো না।
ছদ্মবেশী ডাক্তার ও নিষ্ঠুরতা: এই অব্যবস্থাপনার সত্যতা যাচাই করতে জার্নালিস্ট ডোনাল্ড ম্যাকইন্টায়ার ডাক্তার সেজে সেখানে যান এবং তাকে খুব সহজেই ডাক্তারি করতে দেওয়া হয়। ম্যাকইন্টায়ার সাহেব আরও দেখতে পান, চিকিৎসালয়ে মানসিকভাবে অসুস্থ বাচ্চাদের সারাদিন দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা হতো, যাতে তারা জ্বালাতন করতে না পারে।
অমানবিক পরিবেশ: সেখানে যথাযথ স্যানিটেশন ব্যবস্থা কিংবা রোগীদের জন্য কোনো গরম পানির ব্যবস্থা ছিল না। অসুস্থ রোগীদের গোসল করানো হতো ঠান্ডা পানি দিয়ে। রোগীরা হাসপাতালে হিটার বসানোর দাবি করলেও তা আমলে নেওয়া হয়নি; কারণ দর্শানো হয়েছিল যে এতে নাকি যীশু অখুশি হবেন!
সংক্রমণের ঝুঁকি: এখানেই শেষ নয়, এক সুঁই দিয়ে ইনজেকশন পুশ করা হতো একাধিক ব্যক্তির শরীরে। সেই সুঁই গরম পানিতে ফুটিয়ে জীবাণুমুক্ত করা তো দূরের কথা, শুধুমাত্র ট্যাপের সাধারণ পানিতে ধুয়েই আরেকজনের শরীরে ঢুকানো হতো। অথচ সেসব চিকিৎসালয়ে এইডস আক্রান্ত রোগীও ছিল!
ওষুধের অপব্যবহার: রোগীদের মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ প্রদান আর ভুল চিকিৎসা ছিল এখানকার নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। চিকিৎসার নামে এমন চরম দায়িত্বহীনতা আর অবহেলার জন্য যে কত মানুষের প্রাণ গিয়েছে, তার সঠিক হিসাব নেই কারও কাছে।
অথচ মাদার তেরেসা যেন এসব দেখেও দেখতেন না, সম্পূর্ণ উদাসীন ছিলেন এই ব্যাপারে। হয়তো ভাবছেন, অর্থের অভাবে প্রশিক্ষিত ডাক্তার বা ভালো চিকিৎসা সরঞ্জাম রাখা সম্ভব হয়নি। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রতিবছর গড়ে মাদার তেরেসা বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে প্রায় ৩০ মিলিয়ন (৩ কোটি) ডলারের মতো অনুদান পেতেন। তিনি মারা যাওয়ার পর আন্তর্জাতিক বিভিন্ন রিপোর্টে উঠে আসে যে, তাঁর ভ্যাটিকান ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বিপুল পরিমাণ অর্থ সঞ্চিত ছিল। তেরেসার সমালোচকদের মতে, এই ফান্ডের পরিমাণ এত বেশি ছিল যে তা একবারে তুলতে গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের তারল্য সংকট দেখা দিত। কাজেই টাকা-পয়সার অভাব নিশ্চয়ই ছিল না। তাহলে সেবার মান এমন ছিল কেন? আর এত এত অনুদানের টাকা যেতই বা কোথায়? তিনি যদি সত্যিই মানুষের দুঃখ-কষ্ট দূর করতে চাইতেন, তবে এই বিপুল অর্থ দিয়ে গরিবদের স্বাবলম্বী কেন করেননি?
বিভিন্ন রিপোর্ট অনুযায়ী, মাদার তেরেসার মুখ্য উদ্দেশ্য নিখাদ মানবসেবা ছিল না; বরং তার প্রধান লক্ষ্য ছিল মানবসেবার আড়ালে মানুষকে খ্রিস্টধর্মের প্রতি আকৃষ্ট করা এবং তাদের মধ্যে ধর্ম প্রচার করা। যদি তাই না হবে, তবে মৃত্যুপথযাত্রী রোগীদের ভুলিয়ে-ভালিয়ে খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিত করানোর চেষ্টা চালানো হতো কেন? যে বিপুল পরিমাণ অনুদান তিনি পেতেন, তার বেশিরভাগই খরচ হতো ক্যাথলিক চার্চের উন্নয়ন আর প্রসারের কাজে, প্রকৃত মানবসেবায় নয়। সেবা ছিল মূলত অনুদান পাওয়া আর বিশ্ববাসীর কাছে এক 'মহৎ ভাবমূর্তি' তৈরির মোক্ষম হাতিয়ার।
অনেকের মতে, দারিদ্র্য দূর করা তাঁর মিশনারির উদ্দেশ্য ছিল না, কারণ দারিদ্র্য দূর হয়ে গেলে অনুদান আসবে কোন উসিলায়? মাদার তেরেসার নিজের কথাতেই এর ইঙ্গিত মেলে। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন: "আই থিঙ্ক দ্য ওয়ার্ল্ড ইজ বিইং মাচ হেল্পড বাই দ্য সাফারিং অফ দ্য পুওর পিপল" (I think the world is being much helped by the suffering of the poor people)। এই বিপুল পরিমাণ ডোনেশনের টাকার সব উৎসের খোঁজ পাওয়া মুশকিল, তবে কিছু বিতর্কিত উৎসের উদাহরণ দেওয়া যাক। চার্লস কিটিং নামের এক ব্যক্তি মিশনারিতে বড় অঙ্কের অর্থ অনুদান দেন, যার কিছুদিন পরেই টাকা আত্মসাতের অভিযোগে তাঁর জেল হয়। অন্যের টাকা মেরে দিয়ে সেই টাকায় দান করে পুণ্য কামানোর ধান্দায় ছিলেন এই লোক। কিন্তু অবাক করা বিষয় হচ্ছে, এই জালিয়াতির ঘটনা জানার পরও মাদার তেরেসা সেই অর্থ তার আসল মালিককে ফেরত দেননি। তাছাড়া বিভিন্ন মাফিয়া ডন, বিতর্কিত রাজনৈতিক নেতা বা দুর্নীতিবাজ আমলাদের অনুদানও তিনি সবসময় সাদরে গ্রহণ করেছেন। আর এই বিপুল অর্থ কোথায় কীভাবে খরচ হতো, তার কোনো স্বচ্ছ হিসাবও ছিল না। এটা অবশ্য শুধু তেরেসার মিশনারি নয়, গোটা বিশ্বের অনেক ধর্মীয় মিশনারিই এভাবে ছাড় পেয়ে আসে; তাদের আয়-ব্যয়ের হিসাব দেখতে চায় না কোনো দেশের সরকারই।
কথায় আছে, "নেভার মিট ইয়োর হিরোস" (Never meet your heroes)। দুঃখজনক হলেও কথাটি অনেক বেশি সত্যি। আমরা সাধারণ মানুষরা যাদের আইডল মানি, ভক্তি-শ্রদ্ধা করি, দূর থেকে দেখলে তাদেরকে নিখুঁত মনে হয়। কিন্তু আমরা ভুলে যাই, নিখুঁত মানুষ বলে পৃথিবীতে কিছুই নেই। তাই যখন তাদেরকে খুব কাছ থেকে জানা যায়, তখন অনেক সময়ই আমরা বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়ি।
মাদার তেরেসার সেবার আড়ালের এই গল্প শুনে আপনার মনেও সেই শ্রদ্ধাবোধে আঘাত লাগাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। হ্যাঁ, তাঁর উদ্দেশ্য যাই হোক না কেন, চিকিৎসালয়গুলোর মাধ্যমে কিছু মানুষের উপকার যে একেবারে হয়নি, তা কিন্তু না। তবে শৈশব থেকে মাদার তেরেসাকে যেভাবে পরম দয়ালু ও সৌম্য মূর্তিতে চিনে এসেছি আমরা, বাস্তবতার নিরিখে তাঁর সেই রূপটি কিন্তু ততটা নিখুঁত ও সুন্দর নয়।
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more