প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: জুন ২৫, ২০২৬, ২:৫৫ পি.এম
এক বিষাক্ত জনপদের গল্প
অ-অ+
ডকুমেন্টারি - চামড়া শিল্পের অন্তরালে
১৯৪০ সালে ব্যবসায়ী আর. পি. সাহা নারায়ণগঞ্জে স্থাপন করেন দেশের প্রথম ট্যানারি, যা পরবর্তীতে ১৯৪৫ সালে ঢাকার হাজারীবাগে স্থানান্তরিত হয়। সেই থেকে শুরু হয় এই অঞ্চলের চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের আনুষ্ঠানিক যাত্রা। তৈরি পোশাক শিল্পের পর চামড়া বা ট্যানারি শিল্প বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি খাত, যা থেকে দেশের আয় বছরে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার। সম্ভাবনাময় এ খাতকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে কর্মসংস্থানের বিশাল এক বাজার। এসব প্রক্রিয়াজাত চামড়া রপ্তানি করা হয় ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। দেশের চামড়া দিয়ে বিশ্বমানের নামী-দামী প্রতিষ্ঠানগুলো বিলাসবহুল পণ্য তৈরি করে তা চড়া দামে বিক্রি করছে বিশ্ববাজারে।
তবে মুদ্রার যেমন এপিঠ-ওপিঠ রয়েছে, চামড়া শিল্পের ক্ষেত্রেও ঠিক তেমনটিই দৃশ্যমান। চারদিকে চামড়া বা ট্যানারি শিল্পের এত জয়জয়কার শুনলেও এক কালো এবং অপ্রিয় সত্য সবসময়ই থেকে যায় পর্দার আড়ালে। চামড়া শিল্পকে পুঁজি করে বাংলাদেশ অর্থনীতিতে ঠিক যতটাই সফলতা এনেছে, এই শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট সাধারণ মানুষের জীবন ঠিক ততটাই মানবেতর ও অবহেলিত। সাধারণভাবে চামড়াজাত পণ্যের দাম এবং চাহিদা সবসময়ই উর্ধ্বমুখী থাকে। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে কোনো না কোনোভাবে আমরা চামড়াজাত পণ্য ব্যবহার করছি। কিন্তু ট্যানারিগুলোতে এই কাঁচা চামড়া প্রক্রিয়াজাত করে শিল্পের কাঁচামালের রূপ দেওয়ার পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত বিষাক্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ।
শ্রমিকেরা চরম স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে এসব ট্যানারিতে দিন-রাত কাজ করে চলেছেন। এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ট্যানারিতে কাজ করা শতকরা ৯০ শতাংশ শ্রমিকই অবর্ণনীয় রাসায়নিকজনিত রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে ৫০ বছর বয়সের আগেই মারা যান। সেই সাথে ট্যানারির বিষাক্ত বর্জ্য প্রতিনিয়ত পরিবেশের যে মারাত্মক দূষণ ঘটাচ্ছে, তা কল্পনাতীত। এই শিল্পের বর্জ্যগুলো হরহামেশাই নদীতে সরাসরি অপসারণ করতে দেখা যায়, যা পরিবেশ বিপর্যয়ের অন্যতম প্রধান কারণ। ট্যানারি সংলগ্ন অঞ্চলের মানুষের কাছে ডায়রিয়া, চোখ হলুদ হয়ে যাওয়া কিংবা শরীর ফ্যাকাসে হয়ে যাওয়া খুবই সাধারণ এবং নিত্যদিনের বিষয়। প্রতিনিয়ত দূষিত পানি ও রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসার ফলে এই অঞ্চলের মানুষগুলো হেপাটাইটিস, জন্ডিস, চর্মরোগ এবং ক্যান্সারের মতো মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এক কথায়, তাদের শরীরে প্রতিনিয়ত প্রবেশ করছে ধীরগতির মারাত্মক বিষ। কাজের ভয়াবহ পরিণতি জানলেও শুধু দুবেলা পেটে ভাতে বেঁচে থাকার তাগিদে এই প্রান্তিক মানুষগুলো প্রতিনিয়ত ঝুঁকি নিয়েই কাজ করে যাচ্ছেন।
প্রতিদিন প্রায় ২২,০০০ কিউবিক মিটার বিষাক্ত ট্যানারি বর্জ্য এসে পড়ে নদীতে। কারখানা থেকে ক্রোমিয়ামসহ বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক কেমিক্যাল বের হয়ে শহরের ড্রেনগুলোতে মিলিত হয় এবং এই বিষাক্ত পানি সরাসরি গিয়ে মেশে বুড়িগঙ্গায়। যে বুড়িগঙ্গা নদীকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকার কয়েক লক্ষ মানুষের জীবিকা নির্বাহ হয় এবং কোটি কোটি মানুষের জীবনের প্রত্যক্ষ সংযোগ রয়েছে, ট্যানারি বর্জ্যের কারণে সেই বুড়িগঙ্গা এখন একটি মৃতপ্রায় নদী। হাজারীবাগ একসময় পৃথিবীর সবচেয়ে জঘন্যভাবে দূষিত ১০টি এলাকার মধ্যে একটি হিসেবে তালিকায় স্থান করে নিয়েছিল। এখানে শুধু মানুষ নয়; পানি, মাটি ও বাতাস সবকিছুই যেন বিষে জর্জরিত।
পরিবেশ আইন লঙ্ঘন করে বছরের পর বছর ধরে চলা এই দূষণের কোনো দায়ভার বহন করতে মালিকপক্ষ নারাজ। এই অপরাধের জন্য তাদের কোনো জবাবদিহিও করতে হয় না। এই এলাকার আশেপাশের মানুষজন এক দুর্বিষহ জীবনযাপন করেন। ট্যানারির আবর্জনা ও পশুর মৃতদেহের স্তূপের মধ্যে বাসিন্দারা একরকম আটকা পড়ে গেছেন। গরুর গোবর থেকে শুরু করে রাসায়নিক আবর্জনা, পলিথিন, মানুষের মল ও পশুর হাড্ডি—সবকিছুর দুর্গন্ধে এই এলাকার মানুষজনকে একটু পরিষ্কার নিঃশ্বাস নেওয়ার জন্য প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করতে হয়।
ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরের কেন্দ্রস্থলে এই বিষাক্ত শিল্পকারখানার অবস্থান একদমই অস্বভাবিক হওয়ায়, হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি শিল্প সরিয়ে নেওয়ার দাবি ওঠে বারবার। অবশেষে নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ২০১৭ সালে সাভারের হেমায়েতপুরে প্রায় ১,০১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে গড়ে তোলা হয় চামড়া শিল্প নগরী। এই স্থানান্তরের মূল উদ্দেশ্য ছিল বুড়িগঙ্গাকে বাঁচানো, পরিবেশ দূষণ রোধ করা এবং শ্রমিকদের একটি উন্নত ও সচ্ছল জীবনযাপন নিশ্চিত করা।
ট্যানারি স্থানান্তরের পর বেশ কয়েক বছর পার হয়ে গেলেও মূল সংকটের সমাধান মেলেনি। সাভারের ট্যানারি পল্লী এখন হাজারীবাগেরই এক নতুন প্রতিচ্ছবি মাত্র। ট্যানারি মালিকদের দেওয়া হয়েছে প্রায় চার গুণ ক্ষতিপূরণ, কিন্তু হতভাগ্য শ্রমিকদের ভাগ্যের চাকা ঘোরেনি। এক বুক আশা নিয়ে শ্রমিকেরা সাভারে এলেও তাদের জন্য উন্নত আবাসন, ন্যায্য বেতন, চিকিৎসা ব্যবস্থা, ক্যান্টিন বা সন্তানদের জন্য স্কুলের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা আজ শুধু কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ। এখানে এসে শ্রমিকদের জীবনধারণের ব্যয় ও অনিশ্চয়তা বাড়লেও বাড়েনি তাদের বেতনের একটি টাকাও। আবাসন ব্যবস্থা না থাকায় অনেক শ্রমিককে প্রতিদিন হাজারীবাগ থেকে বিপুল টাকা গাড়ি ভাড়া গুনে সাভারে যাতায়াত করতে হয়। যেখানে তাদের মাসিক পারিশ্রমিক মাত্র ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা, সেখানে যাতায়াত ও থাকা-খাওয়ার খরচ মেটাতেই তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। ফলে আগের তুলনায় তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গেছে প্রায় তিন গুণ।
কোরবানির ঈদের পর চামড়া প্রক্রিয়াকরণের সময় দৈনিক বর্জ্য উৎপন্ন হয় প্রায় ৫০,০০০ ঘনমিটার এবং বছরের বাকি সময় তা থাকে প্রায় ৪০,০০০ ঘনমিটার। অথচ সাভারের কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার বা সিইটিপির (CETP) বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সর্বোচ্চ সক্ষমতা রয়েছে মাত্র ২৫,০০০ ঘনমিটারের। ফলে প্রতিদিনের বাকি বিশাল পরিমাণের বিষাক্ত বর্জ্য সরাসরি মিশছে সাভারের ধলেশ্বরী নদীতে। ধলেশ্বরী নদীও এখন বুড়িগঙ্গার মতোই কালচে ও বিষাক্ত রূপ ধারণ করেছে, যা পরিবেশের জন্য এক চরম বিপর্যয় ডেকে আনছে। ট্যানারি স্থানান্তরের পর থেকে অব্যবস্থাপনা আর সঠিক পরিকল্পনার অভাবে চামড়া শিল্প থেকে জাতীয় আয় আশঙ্কাজনক হারে কমছে। কাঁচা চামড়ার মূল্যের ভয়াবহ নিম্নমুখিতা, সিন্ডিকেট ব্যবসা, মৌসুমী ব্যবসায়ীদের লোকসান আর কাঁচা চামড়া নদীতে ফেলে দেওয়ার মতো ঘটনা প্রতি বছরের নিয়মিত চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে খুব দ্রুতই মুখ থুবড়ে পড়তে চলেছে দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় এই রপ্তানি খাত।
দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে এবং বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে চামড়া শিল্পের গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু এই উন্নয়ন কোনোভাবেই পরিবেশ ও হাজার হাজার শ্রমিকের জীবনকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়ে হতে পারে না। এই পরিস্থিতি যতদিন চলতে থাকবে, কারখানা সংলগ্ন মানুষ ও শ্রমিকেরা নিজেদের স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ হারাতে থাকবে। তাই এখনই সময়, অবিলম্বে কঠোর আইনি নজরদারির মাধ্যমে এই চামড়া শিল্পকে সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব উপায়ে রূপান্তর করা অত্যন্ত জরুরি।
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more