ঈদে মিলাদুন্নবী: উদযাপনের ইতিহাস , বিতর্ক ও ইসলামের ব্যাখ্যা
Date: 2026-08-26
প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: আগস্ট ২৬, ২০২৬, ৮:০৭ এ.এম
ঈদে মিলাদুন্নবী: উদযাপনের ইতিহাস , বিতর্ক ও ইসলামের ব্যাখ্যা
অ-অ+
ঈদে মিলাদুন্নবী:
প্রতিবছর ১২ই রবিউল আউয়াল আসলেই বাংলাদেশে একই দৃশ্য দেখা যায়। একদিকে লাখো মানুষের জুলুস, ট্রাকে ট্রাকে গজল এবং মসজিদে মসজিদে মিলাদ; অন্যদিকে ফেসবুকে একদল বলেন— ঈদে মিলাদুন্নবী বিদআত, কেউ কেউ আবার বলেন ইসলামে ঈদে মিলাদুন্নবী করা হারাম। অথচ দু'পক্ষই কিন্তু একই নবীকে ভালোবাসেন। তাহলে এই দ্বন্দ্বটা আসলে কোথায়?
ঈদে মিলাদুন্নবী মানে হলো নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মদিনে আনন্দ প্রকাশ করা। আরবিতে 'মিলাদ' মানে জন্ম আর 'ঈদ' মানে আনন্দ বা উৎসব। অনেকে মনে করেন এটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সময় থেকেই ছিল। রাসূলের জীবদ্দশায় সাহাবীরা তাঁর প্রশংসায় কবিতা ও বক্তব্য দিয়েছেন। যেমন— হাসসান ইবনে সাবিত (রা.) তাঁর প্রশংসায় কবিতা পাঠ করতেন। ফলে রাসূলের গুণাবলী আলোচনা এবং প্রশংসা করা নিষিদ্ধ নয়। অনেকে যুক্তি দেখান, হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই দিনটি উদযাপন করেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতি সোমবার রোজা রাখতেন এবং তাঁকে সোমবার রোজা রাখার কারণ জিজ্ঞাসা করা হলে সহীহ মুসলিম শরীফের হাদিস অনুযায়ী তিনি বলেন, "এই দিনে আমি জন্মেছি এবং এই দিনেই আমার উপর ওহি নাজিল হয়েছে।" অর্থাৎ, হযরত নিজেই নিজের জন্মদিনকে স্মরণ করেছেন এবং সে উপলক্ষে বিশেষ আয়োজন করেছেন। তাহলে সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে পালনে সমস্যাটি কোথায়? মূলত আলোচনাটি উদযাপনের ধরন নিয়ে।
যেভাবে জাকজমকপূর্ণভাবে হযরতের জন্মদিন উদযাপন করা হয়, ঐতিহাসিকভাবে সূচনালগ্নে এমনটি ছিল না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ৬৩ বছরের জীবন, আবু বকর, ওমর, ওসমান ও আলী (রা.)-এর খিলাফত, এরপর উমাইয়া ও আব্বাসী শাসনামলের প্রায় ৬০০ বছর পর্যন্ত এই ধরনের কোনো আনুষ্ঠানিক ঈদে মিলাদুন্নবীর অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। প্রথম বড় আকারে এর প্রচলন করেন ইরাকের ইরবিলের শাসক বাদশাহ মুজাফফর উদ্দিন ককবুড়ি (৬০৪ হিজরিতে)। ঐতিহাসিক ইবনে খাল্লিকান লিখেছেন, তিনি এই দিনে বিশাল অনুষ্ঠান করতেন, গরিবদের খাওয়াতেন এবং সুফি আলেমদের ডেকে আনতেন। পরে মিশরে ফাতিমী শাসনামলে এটি আরো রাষ্ট্রীয় রূপ পায় এবং ভারতবর্ষে এই ঈদে মিলাদুন্নবী আসে মুঘল আমলে।
যাঁরা এটি পালন করেন— বিশেষ করে বেরলভী ও সুফি ঘরানার আলেমরা এবং বাংলাদেশের বড় অংশের মানুষ— তাঁদের এই উদযাপনের পক্ষেও যুক্তি রয়েছে। সূরা ইউনুসের ৫৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, "আল্লাহর অনুগ্রহ এবং রহমত পেয়ে তারা যেন আনন্দ করে।" আর সূরা আম্বিয়ায় বলা হয়েছে— "হে নবী! আপনাকে জগতসমূহের জন্য রহমত হিসেবে প্রেরণ করা হয়েছে।" কাজেই সবচেয়ে বড় রহমতের আগমনে আনন্দ করা তো কুরআনেরই নির্দেশ। তাছাড়া রাসূলের সোমবারে উদযাপনের হাদিসও এর বড় প্রমাণ। মনে রাখা উচিত, নবীকে ভালো না বাসলে ঈমান পূর্ণ হয় না; ফলে এই জুলুস, এই পতাকা ও এই মাহফিল হলো সেই ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। একটি দিনের অসিলায় হাজারো মানুষ নবীর জীবনী শোনে। বিশেষ করে যখন তরুণ প্রজন্ম নবীকে ভুলে যাচ্ছে, তখন এমন একটি উৎসবই তাঁদের নবীর সঙ্গে সংযুক্ত করে।
অন্যদিকে দেওবন্দী, আহলে হাদিস ও সালাফি ঘরানার আলেমরা কেন এটি পালন করেন না, তাঁদের যুক্তিও কিন্তু নবীপ্রেম থেকেই উদ্ভূত। প্রথমত, সাহাবীরা এটি করেননি— এটাই তাঁদের সবচেয়ে বড় দলিল। যে সাহাবীরা নবীর জন্য জীবন দিয়েছেন, তাঁরা কেউ কোনোদিন ১২ তারিখে জুলুস করেননি। আবু বকর (রা.) প্রায় আড়াই বছর খলিফা ছিলেন, কিন্তু তিনি একবারও এই দিন পালন করেননি। এটি এত সওয়াবের কাজ হলে সাহাবীরা কখনোই পিছিয়ে থাকতেন না। আরেকটি যুক্তি হলো— ইসলামে ঈদ কেবল দুটি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় এসে দেখলেন মানুষ দুটি উৎসব পালন করে, তখন তিনি বললেন— আল্লাহ তোমাদের এর চেয়ে উত্তম দুটি দিন দিয়েছেন: ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। এর বাইরে তৃতীয় কোনো দিনকে ঈদ হিসেবে দ্বীনের অংশ বানানোর অর্থ দ্বীনে নতুন কিছু যোগ করা।
যাঁরা ঈদে মিলাদুন্নবী আয়োজনকে বিদআত বলেন, সে বিষয়েও ইসলামের নানা ব্যাখ্যা রয়েছে। হযরত ওমর (রা.) যখন সবাইকে নিয়ে তারাবীর জামাত চালু করলেন, তখন বলেছিলেন— "কতই না উত্তম এই নতুন পদ্ধতি!" ইমাম শাফেয়ী (রহ.) বিদআতকে ভালো ও মন্দ— এই দুই ভাগে ভাগ করেছেন। তাই মিলাদ যদি মানুষকে নবীর দিকে আনে, তবে সেটা উত্তম বিদআত; যে মতের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন ইমাম সুয়ূতী এবং এ নিয়ে 'হুসনুল মাকসিদ ফি আমালিল মাওলিদ' নামে পুরো একটি কিতাব লিখেছেন। তবে আলেমদের অনেকেই এই মতামত মানতে নারাজ। তাঁদের মতে ইবাদতের ক্ষেত্রে সব বিদআতই প্রত্যাখ্যাত, কারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন— "দ্বীনের মধ্যে প্রত্যেক নতুন আবিষ্কারই বিদআত, আর প্রত্যেক বিদআতই ভ্রষ্টতা।" পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি বিরোধ তৈরি হয় বিজাতীয় অনুকরণকে কেন্দ্র করে। খ্রিস্টানরা ঈসা (আ.)-এর জন্মদিনে ক্রিসমাস পালন করে, তাই কিছু আলেমের মতে মুসলমানদের মধ্যে ঈদে মিলাদুন্নবী পালনও সেখান থেকেই এসেছে, অথচ রাসূল (সা.) বিজাতীয় অনুকরণ করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। বিপক্ষে যাঁরা আছেন, তাঁরাও মিলাদুন্নবী অর্থাৎ নবীর জন্মের আলোচনাকে হারাম বলেন না। সারা বছর সিরাত মাহফিল, সিরাত সপ্তাহ বা সোমবারে রোজা রাখা— এগুলোকে সবাই বৈধ বলেন। আবার পক্ষে যাঁরা আছেন, তাঁরাও বলেন না যে এই দিন নামাজের মতো ফরজ ইবাদত; বরং তাঁরা এটাকে বলেন মুস্তাহাব বা মহব্বতের প্রকাশ। অর্থাৎ, ঝগড়াটা নবীর আলোচনা করা যাবে কি না তা নিয়ে নয়; ঝগড়াটা ১২ তারিখকে ঈদ হিসেবে নির্ধারণ করে আনুষ্ঠানিক উৎসব বানানো যাবে কি না— তা নিয়ে। দিনশেষে দুই পক্ষের উদ্দেশ্যই এক— নবীপ্রেম। এক পক্ষ মনে করেন প্রেম প্রকাশ করতে হলে একটি উপলক্ষ দরকার, আর অপর পক্ষ মনে করেন প্রেমের প্রকাশ হতে হবে ঠিক সেইভাবে, যেভাবে সাহাবীরা করেছেন।
ইমাম ইবনে তাইমিয়্যা (রহ.)-এর মতো কঠোর আলেমও বলেছেন, কেউ যদি নবীর মহব্বতে মিলাদ করে, সে নিয়তের জন্য সওয়াব পেতে পারে, যদিও কাজটি সুন্নাহসম্মত নয়। আবার ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ূতী ও হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী প্রমুখ বলেছেন, এর ভিত্তি বিদআত হলেও এতে কল্যাণ রয়েছে। তাই এই বিতর্কে কাউকে কাফের বা নবীর দুশমন বলাটা দুই পক্ষের বড় আলেমরা বারবার নিষেধ করেছেন।
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more