বিশ্বরাজনীতি (পর্ব ১২): আফ্রিকার 'দ্বিতীয় স্বাধীনতা' ও নব্য-উপনিবেশবাদবিরোধী লড়াই
অক্টোবর ১২, ২০২৬, ৫:০৮ এ.এম
প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: অক্টোবর ১২, ২০২৬, ৫:০৮ এ.এম
বিশ্বরাজনীতি (পর্ব ১২): আফ্রিকার 'দ্বিতীয় স্বাধীনতা' ও নব্য-উপনিবেশবাদবিরোধী লড়াই
অ-অ+
বিশেষ সিরিজ | বিশ্ব শাসনের ইতিহাস:
বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে যখন আফ্রিকার একের পর এক দেশ থেকে ইউরোপীয় পতাকা নামিয়ে নতুন স্বাধীন দেশের মুক্ত পতাকা ওড়ানো হচ্ছিল, তখন মনে হয়েছিল শতাব্দীর দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী ও আপসহীন লড়াইয়ের চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়েছে। কিন্তু মানচিত্রে নতুন সীমান্তরেখা আঁকা হলেও আর রাজধানীগুলোতে জাতীয় সংগীত বদলে গেলেও পর্দার পেছনের রূপকথা ছিল ভিন্ন। ভৌগোলিক শাসন শেষ হলেও অর্থনীতির সুতো, খনিজ সম্পদের দখল আর পররাষ্ট্রনীতির চাবিকাঠি থেকে গিয়েছিল সেই পুরনো ঔপনিবেশিক প্রভূদের হাতেই। একেই রাজনৈতিক পরিভাষায় বলা হয় ‘নব্য-উপনিবেশবাদ’ (Neocolonialism)। একবিংশ শতাব্দীর এই রক্তিমলগ্নে এসে মহাদেশ জুড়ে শুরু হয়েছে এক অভূতপূর্ব ও বৈপ্লবিক গর্জন—যাকে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা অভিহিত করছেন আফ্রিকার দ্বিতীয় স্বাধীনতা সংগ্রাম হিসেবে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-উত্তর পর্বে বিশেষ করে পশ্চিম ও মধ্য আফ্রিকায় ফরাসি অর্থোফোনে (Francophone) প্যারিস এমন এক কৌশলী অর্থনৈতিক চাল ছালে, যা স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোকে কার্যত চিরদিনের জন্য জিম্মি করে ফেলে। ‘সিএফএ ফ্রাঁ’ (CFA Franc) নামাঙ্কিত মুদ্রা প্রবর্তনের মাধ্যমে আফ্রিকার অন্তত ১৪টি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভের সিংহভাগ জমা রাখা হতো প্যারিসের তহবিলে। ফরাসি বহুজাতিক কর্পোরেশনগুলো একচেটিয়া অধিকার লাভ করে আফ্রিকার মহামূল্যবান খনিজ তেল, ইউরেনিয়াম, সোনা, হীরা এবং কোকো সম্পদের ওপর। নাইজারের ইউরেনিয়াম দিয়ে প্যারিস আর পুরো ফ্রান্সের বিদ্যুৎ কেন্দ্র আলো ঝলমলে হয়ে উঠলেও নাইজারের শতকরা ৮০ ভাগ মানুষ বাস করত ঘুটঘুঁটে অন্ধকারে। বুর্কিনা ফাসো কিংবা মালির সোনা পশ্চিমাদের ব্যাংকে জমলেও স্থানীয় আফ্রিকানদের কপালে জুটেছে কেবল সীমাহীন দারিদ্র্য, গৃহযুদ্ধ আর রাজনৈতিক অস্থিরতা। বহু দশক ধরে জমা হওয়া এই চরম শোষণ ও অন্যায়ের ক্ষোভ ভেতরে ভেতরে এক বিরাট রাজনৈতিক আগ্নেয়গিরির জন্ম দেয়।
গত কয়েক বছরে আফ্রিকায় যে অভাবনীয় ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে, তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সাহেল (Sahel) অঞ্চল। মালি, বুর্কিনা ফাসো, নাইজার এবং পরবর্তীতে গ্যাবনের মতো দেশগুলোতে সামরিক নেতৃত্ব ও সাধারণ তরুণ প্রজন্মের এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধন ঘটেছে। ফরাসি সেনাদের উপস্থিতি সত্ত্বেও যখন অঞ্চলে সন্ত্রাসবাদ ও দারিদ্র্য কমেনি, তখন এই দেশগুলোর জাতীয়তাবাদী নেতারা সরাসরি প্যারিসের নির্দেশ অমান্য করার চূড়ান্ত সাহস দেখান। তারা দেশ থেকে ফরাসি সামরিক ঘাঁটি গুটিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেন, ফরাসি কূটনীতিবিদ ও বিদেশি গণমাধ্যমকে বহিষ্কার করেন এবং নিজেদের জাতীয় সম্পদের ওপর শতভাগ সার্বভৌমত্ব দাবি করেন। বুর্কিনা ফাসোর তরুণ সামরিক নেতা ইব্রাহিম ত্রাওরে কিংবা নাইজারের নীতিনির্ধারকদের স্পষ্ট বার্তা ছিল—"আমরা আর আমাদের সম্পদের বিনিময়ে দাসত্ব কিনব না।" এটি কেবল কোনো সামরিক অভ্যুত্থানের ঘটনা নয়; এটি ছিল পশ্চিমাদের কয়েক শতাব্দীর পরোক্ষ শাসনের বুকে এক সরাসরি ও ঐতিহাসিক চড়।
আফ্রিকার এই 'দ্বিতীয় স্বাধীনতা' আন্দোলনের বড় শক্তিমত্তা হলো এক-মেরুভিত্তিক মার্কিন ও পশ্চিমা শক্তির বিকল্প তৈরি হওয়া। বর্তমান বিশ্বে আফ্রিকা আর কেবল ওয়াশিংটন বা প্যারিসের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে না। চীনের সুদূরপ্রসারী ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (BRI) মহাদেশ জুড়ে তৈরি করেছে বিশ্বমানের বন্দর, সেতু, রেললাইন ও অবকাঠামো। এর পাশাপাশি সামরিক সুরক্ষা ও কৌশলগত সহযোগিতায় রাশিয়ার প্রবেশ এবং ভারত ও তুরস্কের মতো উদীয়মান বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সাথে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য আফ্রিকা মহাদেশকে এক বিশাল সুবিধাজনক অবস্থানে এনে দিয়েছে। আফ্রিকান ইউনিয়ন (AU) এখন বৈশ্বিক জি-২০ (G20) ব্লকের স্থায়ী সদস্য হিসেবে গ্লোবাল সাউথের প্রতিনিধিত্ব করছে। বিশ্বের প্রযুক্তি বিপ্লবের জন্য প্রয়োজনীয় বিরল খনিজ (যেমন- কোবাল্ট, লিথিয়াম) আফ্রিকার বুকে সঞ্চিত থাকায় বিশ্বরাজনীতিতে আফ্রিকার দরকষাকষির ক্ষমতা এখন ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে।
আফ্রিকার নব্য-উপনিবেশবাদবিরোধী এই ঐতিহাসিক লড়াই প্রমাণ করে দিয়েছে যে, একবিংশ শতাব্দীর উদীয়মান বহু-মেরুভিত্তিক (Multipolar) বিশ্বব্যবস্থায় আফ্রিকাকে আর কোনো পরাশক্তির খেলার দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। রক্তে অর্জিত ভৌগোলিক স্বাধীনতার পর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত এই 'দ্বিতীয় স্বাধীনতা' মহাদেশটিকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর এক মহান আত্মমর্যাদা এনে দিচ্ছে। আফ্রিকানদের এই হুঙ্কার আজ স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিচ্ছে—বিশ্ব শাসনের নতুন মানচিত্রে আফ্রিকা আর কোনো নিষ্ক্রিয় দর্শক নয়, বরং বিশ্বরাজনীতি পুনর্গঠনের এক শক্তিশালী চালিকাশক্তি।
(আগামীকাল ১৩ই অক্টোবর, ত্রয়োদশ পর্বে থাকছে: মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি: আব্রাহাম চুক্তি ও আরব-ইসরায়েল সম্পর্কের নতুন সমীকরণ)
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more