বিশ্বরাজনীতি (পর্ব ৬): সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ও মার্কিন আধিপত্যের সূচনা
Date: 2026-10-06
প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: অক্টোবর ০৬, ২০২৬, ৫:১০ এ.এম
বিশ্বরাজনীতি (পর্ব ৬): সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ও মার্কিন আধিপত্যের সূচনা
অ-অ+
বিশেষ সিরিজ | বিশ্ব শাসনের ইতিহাস:
১৯৯১ সালের ২৫ ডিসেম্বর, বড়দিনের হিমশীতল এক সন্ধ্যা। মস্কোর ক্রেমলিন প্রাসাদের চূড়ায় যে দৃশ্যটি রচিত হয়েছিল, তার প্রভাব আজও প্রতিটি আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও ভৌগোলিক মানচিত্রে স্পষ্টভাবে বিদ্যমান। দীর্ঘ সাড়ে চার দশক ধরে পৃথিবীর অর্ধেকটা শাসন করা সাম্যবাদের লাল পতাকাটি ধীরে ধীরে নেমে গেল, আর তার জায়গায় উড়লো রাশিয়ার ত্রিবর্ণ পতাকা। কোনো পারমাণবিক ধ্বংসযজ্ঞ নয়, কোনো বিশাল বিশ্বযুদ্ধ নয়—বরং ভেতর থেকেই গুঁড়িয়ে গেল বিংশ শতাব্দীর অন্যতম সামরিক ও রাজনৈতিক দানব ‘সোভিয়েত ইউনিয়ন’। আর এর মধ্য দিয়ে ঘটে গেল বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে নাটকীয় ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তন: ‘দ্বি-মেরু বিশ্ব’ ব্যবস্থার চূড়ান্ত মৃত্যু এবং যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র বিশ্ব শাসনের এক অভূতপূর্ব সূচনা।
একটি সুবিশাল পরাশক্তির এভাবে ভেঙে পড়ার পেছনে লুকিয়ে ছিল দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক জরাজীর্ণতা ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ব্যর্থতা। স্নায়ুযুদ্ধের সামরিক মহড়া চালাতে গিয়ে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পাল্লা দিয়ে পারমাণবিক অস্ত্রের পাহাড় গড়তে গিয়ে সোভিয়েত অর্থনীতি ভেতরে ভেতরে পুরো ধসে পড়েছিল। তার ওপর আফগানিস্তানের ধূসর পাহাড়ে এক দশকের ব্যর্থ সামরিক অভিযান—যাকে বলা হয় সোভিয়েতের ‘ভিয়েতনাম’—মস্কোর কোষাগার ও সামরিক আত্মবিশ্বাস দুটোকেই শেষ করে দেয়। সংকট থেকে উত্তরণের শেষ চেষ্টা হিসেবে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মিখাইল গর্বাচেভ নিয়ে এসেছিলেন দুটি ঐতিহাসিক সংস্কার নীতি: ‘গ্লাসনস্ত’ (রাজনৈতিক উন্মুক্ততা) ও ‘পেরেস্ত্রোইকা’ (অর্থনৈতিক পুনর্গঠন)। কিন্তু দীর্ঘদিনের অবরুদ্ধ সমাজতন্ত্রের ওপর হঠাৎ স্বাধীন বাতাসের ধাক্কা সামলাতে পারেনি ক্রেমলিন। পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে মুক্তির মিছিল ছড়িয়ে পড়ে, চুরমার হয়ে যায় বার্লিন প্রাচীর, আর একে একে ১৫টি স্বতন্ত্র সার্বভৌম রাষ্ট্রে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায় পরাক্রমশালী সোভিয়েত ইউনিয়ন।
সোভিয়েত ইউনিয়নের এই আকস্মিক পতনে বিশ্বরাজনীতিতে যে বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছিল, তা মুহূর্তের মধ্যেই নিজের দখলে নিয়ে নেয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে শুরু হওয়া ক্ষমতার ভারসাম্য ভেঙে গিয়ে আত্মপ্রকাশ ঘটে ‘এক-মেরু বিশ্ব’ বা Unipolar World-এর। আন্তর্জাতিক রাজনীতি, ভূ-রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, বিশ্ব বাণিজ্য এবং সামরিক শক্তির শীর্ষে বসলো কেবল একটিই নাম—ওয়াশিংটন। প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ফ্রান্সিস ফুকুইয়ামা এই ঐতিহাসিক মুহূর্তটিকে আখ্যা দিয়েছিলেন ‘দ্য এন্ড অব হিস্ট্রি’ বা ‘ইতিহাসের সমাপ্তি’ হিসেবে। তিনি দাবি করেছিলেন, মানবজাতির বৈचारिक বিবর্তনের লড়াই চূড়ান্ত রূপ পেয়ে গেছে এবং পশ্চিমা উদার গণতান্ত্রিক পুঁজিবাদই পৃথিবীর শেষ ও চূড়ান্ত শাসন ব্যবস্থা হিসেবে জয়ী হয়েছে।
সোভিয়েত ইউনিয়নের বিদায়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কেবল আন্তর্জাতিক মঞ্চের একমাত্র পরাশক্তি হিসেবেই নাম লেখায়নি, বরং পুরো বিশ্বকে নিজেদের ইচ্ছামতো নতুন করে সাজাতে শুরু করে। সোভিয়েত সামরিক জোট ‘ওয়ারশ প্যাক্ট’ বিলুপ্ত হলেও যুক্তরাষ্ট্র তার নিজস্ব সামরিক জোট ‘ন্যাটো’ (NATO)-কে বিলুপ্ত না করে উল্টো তার সীমানা পূর্ব ইউরোপের সাবেক সোশ্যালিস্ট দেশগুলোর দিকে বিস্তৃত করতে থাকে। একই সাথে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক (বিশ্বব্যাংক), আইএমএফ (IMF) এবং মুক্তবাজার অর্থনীতির ডিক্টেশনের মাধ্যমে বিশ্ব অর্থনীতিকে নিজেদের পকেটে নিয়ে আসে ওয়াশিংটন। ১৯৯১ সালের ‘গালফ ওয়ার’ বা প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধেই বিশ্ব প্রথম প্রত্যক্ষ করে এক-মেরু বিশ্বের নজিরবিহীন ক্ষমতা—সোভিয়েত ইউনিয়নের কোনো বাধা ছাড়াই মধ্যপ্রাচ্যে একক সামরিক পরাশক্তি হিসেবে ওয়াশিংটন কীভাবে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে।
তবে ক্ষমতার এই ভারসাম্যহীনতা বা একচ্ছত্র মার্কিন আধিপত্য বিশ্বকে খুব বেশি দিন শান্তিতে রাখতে পারেনি। কোনো শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ না থাকায় বৈশ্বিক রাজনীতিতে এক নতুন অস্থিতিশীলতা ও ক্ষোভের জন্ম হয়। মধ্যপ্রাচ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের স্থায়ী বীজ রোপিত হয় এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন বৈশ্বিক অরাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর উত্থানের পটভূমি তৈরি হয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ও এক-মেরুর বিশ্ব ব্যবস্থা কেবল দুটি পরাশক্তির লড়াইয়ের ইতি টানেনি, বরং একবিংশ শতাব্দীর নিরাপত্তা রূপরেখা, আন্তর্জাতিক চুক্তি এবং বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক শৃঙ্খলকে সম্পূর্ণ নতুন এক ফ্রেমওয়ার্কে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল।
(আগামীকাল পর্ব ৭-এ থাকছে: ৯/১১ পরবর্তী বিশ্বরাজনীতি: সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার রূপান্তর)
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more