বিশ্বরাজনীতি (পর্ব ১৪): মালাক্কা, বাব-এল-মানদেব ও হরমুজ প্রণালীর বৈশ্বিক গুরুত্ব
অক্টোবর ১৪, ২০২৬, ৭:৩১ এ.এম
প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: অক্টোবর ১৪, ২০২৬, ৭:৩১ এ.এম
বিশ্বরাজনীতি (পর্ব ১৪): মালাক্কা, বাব-এল-মানদেব ও হরমুজ প্রণালীর বৈশ্বিক গুরুত্ব
অ-অ+
বিশেষ সিরিজ | বিশ্ব শাসনের ইতিহাস:
বিশ্ব অর্থনীতির বিশাল চাকা ঘূর্ণায়মান রাখার আসল চালিকাশক্তি হলো সমুদ্রপথ, আর এই দীর্ঘ সামুদ্রিক যোগাযোগের সবচেয়ে সংবেদনশীল ও কৌশলগত অংশ হলো কয়েকটি সংকীর্ণ জলপথ বা সামুদ্রিক প্রণালী (Straits)। আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে একে ‘চোকপয়েন্ট’ (Chokepoints) বলা হয়, কারণ এই স্থানগুলোতে বাধা সৃষ্টি হলে পুরো বিশ্ব অর্থনীতিতে ধস নামতে পারে। বর্তমান বিশ্বরাজনীতিতে সামরিক শক্তি প্রদর্শনের পাশাপাশি সামুদ্রিক প্রণালীগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ বা আধিপত্য বিস্তারই হয়ে উঠেছে পরাশক্তিগুলোর অন্যতম প্রধান কৌশলগত যুদ্ধক্ষেত্র—যাকে বলা হয় ‘প্রণালী কূটনীতি’ (Strait Diplomacy)। বিশ্বের বাণিজ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তার চাবিকাঠি ধারণ করে থাকা এমনই তিনটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হলো মালাক্কা, বাব-এল-মানদেব এবং হরমুজ প্রণালী।
বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের হৃৎপিণ্ড বলা হয় পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মধ্যকার সংকীর্ণ হরমুজ প্রণালীকে। বিশ্বের মোট ব্যবহৃত অপরিশোধিত খনিজ তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (LNG) বড় অংশ প্রতিদিন এই এক মাত্র পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। এই অঞ্চলটি ভৌগোলিক ও রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল, কারণ এর এক পাশে রয়েছে ইরান এবং অন্য পাশে মার্কিনঘনিষ্ঠ উপসাগরীয় দেশগুলো। মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো রাজনৈতিক উত্তেজনায় ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধের হুমকি দিলে কিংবা কোনো সামরিক পদক্ষেপ নিলে মুহূর্তের মধ্যেই বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্য আকাশচুম্বী হয়ে পড়ে। ফলে এই প্রণালীর নিরাপত্তা সুনিশ্চিত রাখতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার পঞ্চম নৌবহর (US Fifth Fleet) মোতায়েন রেখেছে, আবার অন্যদিকে চীন ও রাশিয়াও এই এলাকায় নিজেদের কৌশলগত উপস্থিতি জোরদার করছে।
লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগস্থল বাব-এল-মানদেব প্রণালী বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি সামুদ্রিক ধমনী। এটি সুয়েজ খালের প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করে, যা এশিয়া থেকে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় পরিবাহিত পণ্যের দ্রুততম পথ। সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং আঞ্চলিক সংঘাতের প্রভাবে বাব-এল-মানদেব প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা নতুন করে বৈশ্বিক দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যাওয়া এবং বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে আফ্রিকা ঘুরে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে বাধ্য হওয়ার ফলে বিশ্বজুড়ে খাদ্যদ্রব্য ও শিল্পপণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়, যা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রণালীটির নিরবচ্ছিন্ন নিরাপত্তার গুরুত্বকে আবারও স্পষ্ট করে তুলে ধরেছে।
ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের মধ্যবর্তী মালাক্কা প্রণালীটি ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরকে যুক্ত করেছে, যা পূর্ব এশিয়ার অর্থনীতিগুলোর জন্য জীবনরেখা স্বরূপ। বিশেষ করে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি চীনের জন্য এটি সবচেয়ে বড় কৌশলগত দুর্বলতা—যা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ‘মালাক্কা দ্বিধা’ (Malacca Dilemma) নামে পরিচিত। চীনের ব্যবহৃত ৮০ শতাংশেরও বেশি তেলের জোগান এবং বিপুল পরিমাণ বাণিজ্যিক পণ্য এই এক প্রণালী দিয়েই পরিবাহিত হয়। মার্কিন ও তাদের মিত্র দেশগুলোর নৌবাহিনী মালাক্কা প্রণালী অবরুদ্ধ করে দিলে চীনের অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়তে পারে। এই আশঙ্কার কারণেই চীন তাদের বিকল্প বাণিজ্য পথ হিসেবে ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (BRI) এবং পাকিস্তান ও মিয়ানমারের মধ্য দিয়ে সরাসরি ডাঙ্গার পথ উন্মুক্ত করার প্রচেষ্টায় বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে।
বিশ্বায়নের এই যুগে কোনো দেশই নিজের অর্থনীতিকে বিচ্ছিন্ন রাখতে পারে না, আর এই নিরবচ্ছিন্ন বাণিজ্য বজায় রাখা পুরোটাই নির্ভর করে জলপথগুলোর অবাধ চলাচলের ওপর। প্রণালী কূটনীতি তাই কোনো সাধারণ ভূ-রাজনৈতিক বিষয় নয়; এটি সরাসরি প্রতিটি দেশের জাতীয় নিরাপত্তা, মুদ্রাস্ফীতি ও অর্থনীতির স্থিতিশীলতার সাথে যুক্ত। বহু-মেরুভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থায় এই চোকপয়েন্টগুলোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা বা এদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই আগামী দিনে পরাশক্তিগুলোর বৈশ্বিক কৌশল নির্ধারণে সবচেয়ে প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে।
(আগামীকাল ১৫ই অক্টোবর, ১৫তম পর্বে থাকছে: আর্কটিকের বরফ গলন ও নতুন শীতল যুদ্ধ: মেরু অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক লড়াই)
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more