বিশ্বরাজনীতি (পর্ব ৩): প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, উসমানীয় সাম্রাজ্যের পতন
Date: 2026-10-03
প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: অক্টোবর ০৩, ২০২৬, ৭:০০ এ.এম
বিশ্বরাজনীতি (পর্ব ৩): প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, উসমানীয় সাম্রাজ্যের পতন
অ-অ+
বিশেষ সিরিজ | পর্ব ০৩
বিংশ শতাব্দীর সূচনাভাগে ১৯১৪ থেকে ১৯১৮ সাল পর্যন্ত চলা প্রথম বিশ্বযুদ্ধ কেবল রাজপরিবার কিংবা সামরিক শক্তির লড়াই ছিল না, বরং এটি ছিল আধুনিক বিশ্বের ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্র পুনর্নির্ধারণের এক বিধ্বংসী অধ্যায়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিশ্বের রাজনীতি, বাণিজ্য ও ধর্মীয় ভারসাম্যের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা সাম্রাজ্যগুলো এই এক যুদ্ধের তাণ্ডবে চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যায়। বিশেষ করে ছশো বছরেরও বেশি সময় ধরে তিন মহাদেশজুড়ে আধিপত্য বিস্তারকারী উসমানীয় সাম্রাজ্য বা অটোমান এম্পায়ারের পতন এবং যুদ্ধ চলাকালীন মিত্রশক্তিগুলোর গোপন ভূ-রাজনৈতিক চক্রান্ত পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এমন এক জটিল সংকটের মুখে ঠেলে দেয়, যার প্রভাব একশ বছর পরও একবিংশ শতাব্দীর আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সমানভাবে বিদ্যমান।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে উসমানীয় সাম্রাজ্য তৎকালীন জার্মানি ও অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির নেতৃত্বাধীন 'কেন্দ্রীয় শক্তি' বা সেন্ট্রাল পাওয়ার্সের পক্ষে যোগ দেয়। তবে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক মন্দা, সামরিক ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং বলকান যুদ্ধের ধাক্কায় সাম্রাজ্যটি ততদিনে বেশ নাজুক অবস্থায় পড়েছিল। উসমানীয়দের এই ভূ-রাজনৈতিক দুর্বলতার পূর্ণ সুযোগ নেয় মিত্রশক্তি বা এলাইড ফোর্সেস—বিশেষ করে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স। উসমানীয় সাম্রাজ্যকে ভেতরের দিক থেকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে ব্রিটিশ সামরিক গোয়েন্দা অফিসার টি. ই. লরেন্স (ইতিহাসে যিনি 'লরেন্স অব অ্যারাবিয়া' নামে পরিচিত) আরব উপদ্বীপে এক বিশাল রাজনৈতিক চক্রান্ত শুরু করেন। উসমানীয়দের অধীনস্থ আরবদের এক স্বাধীন অখণ্ড আরব রাষ্ট্র গঠনের লোভ দেখিয়ে তুর্কি শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে প্ররোচিত করা হয়, যা ইতিহাসে 'আরব বিদ্রোহ' হিসেবে চিহ্নিত।
একদিকে ব্রিটিশরা যখন আরবদের স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছিল, ঠিক তখনই পর্দার আড়ালে চলছিল বিশ্ব রাজনীতির এক চরম বিশ্বাসঘাতকতা ও গোপন আঁতাত। ১৯১৬ সালে ব্রিটিশ কূটনৈতিক মার্ক সাইকস এবং ফরাসি কূটনৈতিক ফ্রাঁসোয়া জর্জেস-পিকো এক গোপন চুক্তিতে উপনীত হন, যা ইতিহাসে 'সাইকস-পিকো চুক্তি' নামে পরিচিত। এই চুক্তির মূল উদ্দেশ্য ছিল উসমানীয় সাম্রাজ্যের পতন ঘটিয়ে তাদের অধীনে থাকা উর্বর মধ্যপ্রাচ্যকে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করে নেওয়া। চুক্তির শর্তানুযায়ী বর্তমান সিরিয়া ও লেবানন চলে যায় ফরাসিদের নিয়ন্ত্রণে, আর ইরাক, জর্ডান এবং প্যালেস্টাইন বা ফিলিস্তিন অঞ্চলের কর্তৃত্ব পায় ব্রিটেন। শতাব্দী ধরে একসাথে বসবাস করা বিভিন্ন গোষ্ঠী, ধর্ম ও সম্প্রদায়ের সামাজিক বাস্তবতা উপেক্ষা করে স্রেফ পেন্সিল দিয়ে মানচিত্রে কৃত্রিম সীমান্তরেখা টেনে দেয় দুই ঔপনিবেশিক পরাশক্তি।
১৯১৮ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সেন্ট্রাল পাওয়ার্সের পরাজয়ের সাথে সাথে উসমানীয় সাম্রাজ্যের পতন চূড়ান্ত রূপ নেয়। পরবর্তীতে ১৯২২ সালে তুর্কি জাতীয়তাবাদী নেতা মোস্তফা কামাল আতাতুর্কের নেতৃত্বে আনুষ্ঠানিকভাবে উসমানীয় সালতানাত বিলুপ্ত করা হয় এবং ১৯২৪ সালে খিলাফত ব্যবস্থার সম্পূর্ণ অবসান ঘটে। উসমানীয়দের পতনের ফলে যে বিশাল ভূ-রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তা পূরণ করতে মিত্রশক্তি 'লীগ অব নেশনস'-এর মাধ্যমে ম্যান্ডেট ব্যবস্থা চালু করে পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে নিজেদের কলোনিতে রূপান্তর করে। এই গোপন সাইকস-পিকো চুক্তি এবং কৃত্রিম সীমানা নির্ধারণের পরিণতিতেই জন্ম নেয় আধুনিক ইরাক, সিরিয়া, জর্ডান ও লেবাননের মতো রাষ্ট্রগুলো, যার ফলশ্রুতিতে আজও এই অঞ্চল জাতিগত সংঘাত ও অস্থিরতার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে রয়েছে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং উসমানীয় সাম্রাজ্যের পতন কেবল মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিই বদলে দেয়নি, বরং তা বিশ্ব রাজনীতির শক্তির ভরকেন্দ্র ইউরোপ থেকে সরিয়ে ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে স্থানান্তরিত করতে শুরু করে। ব্রিটিশ ও ফরাসিদের এই সাম্রাজ্যবাদী ভাগ-বাটোয়ারা এবং ফিলিস্তিন অঞ্চলে ১৯১৭ সালের বেলফোর ঘোষণার মাধ্যমে একটি ইহুদি রাষ্ট্র গড়ার যে নীল নকশা তৈরি হয়েছিল, তার জের ধরেই পরবর্তীতে জন্ম নেয় বিংশ শতাব্দীর অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংঘাত। উসমানীয়দের পতন ও সাইকস-পিকো চুক্তির ইতিহাস প্রমাণ করে, কীভাবে পরাশক্তিগুলোর টেবিল-চেয়ারে আঁকা কৃত্রিম সীমানা একটি পুরো অঞ্চলকে শতাব্দী ধরে অশান্ত ও রক্তক্ষয়ী করে রাখতে পারে।
(আগামীকাল পর্ব ৪-এ থাকছে: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও বৈশ্বিক ক্ষমতার মেরুকরণ: অক্ষশক্তি বনাম মিত্রশক্তি)
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more