বিডিফেস২৪.কম-এর যে সমীকরণ আপনাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে!
Date: 2026-07-17
প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: জুলাই ১৭, ২০২৬, ৩:৩৬ পি.এম
বিডিফেস২৪.কম-এর যে সমীকরণ আপনাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে!
অ-অ+
বিডিফেস২৪.কম বিশেষ আয়োজন:
আজ বিডিফেস২৪.কম-এর পাঠকদের জন্য আমরা আপনার জীবনের প্রতিটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সময়ের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসেব করব। জানার চেষ্টা করব জীবনের ঠিক কতটুকু অংশ একান্তই আপনার। বোঝার চেষ্টা করব জীবনের হিসেবটা কেন সবসময় অনিশ্চিত। ধর্ম, বর্ণ, জাতি যেটাই হোক না কেন, মানুষ হিসেবে জন্মালে মৃত্যু অবধারিত—একথা আপনাকে বিশ্বাস করতেই হবে। এই স্বল্প দৈর্ঘ্যের আয়ু নিয়ে মানুষের যেন জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই। সবাই ব্যস্ত নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে। এতটাই ব্যস্ত যে, একটা সময় হয়তো আমরা ভুলেই যাই প্রতিনিয়ত সৃষ্টিকর্তার প্রদত্ত আয়ু থেকে একটু একটু করে খরচ করছি আমরা।
বলা হয়ে থাকে, আমাদের এই মহাবিশ্বের বয়স ১৩.৮ বিলিয়ন বছর। আর পৃথিবীতে প্রাণের প্রথম স্পন্দনের অস্তিত্ব মেলে ৩.৬ বিলিয়ন বছর আগে। সে তুলনায় পৃথিবীতে আপনার-আমার কাটানো সময়টা খুবই নগণ্য। তারপরেও একটা হিসেব কষা যাক। বিশ্ব স্বাস্থ্য পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু ৭৪ বছর। সময়টা কিন্তু নেহাত কম নয়। তবে জানেন কি, এ সময়ের ঠিক কতটা অংশ একান্তই আপনার? কয়টা বছর আপনি স্বাধীনভাবে বাঁচতে পারবেন?
ধরা যাক, আপনি একজন সুস্থ ও স্বাভাবিক মানুষ, যার কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকি নেই। আপনার গড় আয়ু ৭০ বছর। আপনি যদি প্রতিদিন অন্তত ৮ ঘণ্টাও ঘুমিয়ে কাটান, তাহলে আপনার জীবনদশার মোট ২৫টি বছর শুধু ঘুমিয়েই কাটাবেন। বাকি থাকল ৪৫ বছর। এবার আলোকিত মানুষ হতে হলে তো আমাদেরকে শিক্ষা গ্রহণ করতেই হবে। আমরা মোটামুটি ৬ বছর বয়স থেকে 'স্কুল' শব্দটার সাথে পরিচিত হই। এরপর উচ্চশিক্ষা বাদ দিলেও ২৪ কিংবা ২৫ বছর বয়সে গিয়ে আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সমাপ্তি ঘটে। সে ক্ষেত্রে স্কুল, কলেজ কিংবা ইউনিভার্সিটিতে আমাদের গড়ে প্রতিদিন ৮ ঘণ্টা অতিবাহিত করতে হয়। এরপর হোমওয়ার্ক, টিউশন, এক্সাম—এসব মিলিয়ে গড়ে আমাদের জীবনের মোট সময়ের ৫টি বছর আমরা লেখাপড়ার পেছনে ব্যয় করি। অবশিষ্ট রইল ৪০ বছর।
স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটির বারান্দায় দৌড়ে এত সময় আর অর্থ ব্যয় করে একটা সার্টিফিকেট নামক পাণ্ডুলিপি তো নিশ্চয়ই পাবেন, যার বদৌলতে একটা চাকরিও জুটবে। এবার আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে আপনাকে ওভারটাইম বাদে ন্যূনতম ৮ ঘণ্টা সময় দৈনিক চাকরির পেছনে ব্যয় করতে হবে। সপ্তাহে ৪০ থেকে ৪৮ ঘণ্টা আপনাকে office-এই কাটাতে হবে। মোটামুটি ৫৫ বছর বয়সে মানুষ চাকরি থেকে অবসর নিয়ে নেয়। তো এবার হিসাব দাঁড়াল, আপনি জীবনে মোটামুটি ৯০ হাজার ঘণ্টা বা ১০টি বছর চাকরি করেই পার করেছেন। এবার আপনার হাতে আয়ু রইল ৩০ বছর।
প্রতিদিন অফিসে যেতেও কিন্তু আমাদের ন্যূনতম একটা সময় ব্যয় করতে হয়। ঢাকা শহরের জ্যামের সাথে তুলনা করলে আমাদের প্রতিদিন মোটামুটি ঘণ্টাখানেক সময় হাতে রেখেই অফিসের জন্য বের হতে হয়। আবার অফিস থেকে ফেরার পথেও কিন্তু ওই একই অবস্থা। তো সে হিসেবে আপনি আপনার জীবনের ২টি বছর জ্যামে বসেই অথবা অফিস যাওয়া-আসার পথে পার করে দেন। আপনার হাতে বাঁচার মতো অবশিষ্ট আছে ২৮ বছর।
জীবন ধারণের জন্য খাবার তো আপনাকে খেতেই হবে। তিন বেলা খাবারের জন্যও আপনাকে প্রতিদিন ন্যূনতম ৭০ থেকে ৮০ মিনিট ব্যয় করতে হয়। মোট হিসেব করলে দাঁড়ায় ৩২ হাজার ঘণ্টা। অর্থাৎ, শুধু খাওয়ার জন্যই আপনি জীবনের ৪টি বছর ব্যয় করেন। তো এখন আপনার কাছে আয়ু আছে ২৪ বছর। এবার খাওয়া শেষে নিশ্চয়ই কিছু সাফ-সাফাইয়ের কাজ থাকে। তাছাড়া ঘর পরিষ্কার, জামাকাপড় ধোয়া-মোছা, টয়লেট কিংবা গোসলের মতো বিবিধ কাজে গড়ে জীবনের আরও ৪টি বছর ব্যয় করি আমরা। তো বাঁচল ২০ বছর। মোবাইল ফোন ছাড়া নিজেকে কল্পনা করতে পারেন কি? একদমই না। এই মোবাইলের পেছনে আমরা প্রতিদিন গড়ে ৬ ঘণ্টা সময় খরচ করি। অর্থাৎ, গড়ে জীবন থেকে ১৫টি বছর এই মোবাইল ফোন কেড়ে নেয়। এবার বাঁচল মাত্র ৫ বছর!
যাক, হয়তো সবকিছু বাদ দিয়ে এবার এই ৫টি বছর নিজের মতো করে বাঁচবেন। তাই তো? ধরে নিলাম ৫৫ বছর বয়সে অবসর নেবেন এবং তারপর বিলাসবহুল জীবনযাপন করবেন—যদি শরীরে কুলায় তো। কিন্তু চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর যে ১৫ বছর আপনার হাতে অবশিষ্ট থাকে, সে সময়টার অধিকাংশ জুড়েই আপনাকে গ্রাস করে রাখবে ডায়াবেটিস, হার্টের রোগের মতো নানা জটিল সব বার্ধক্যজনিত রোগ। বাকি জীবনটা কেটে যাবে ওই হাসপাতালের বারান্দাতেই। তাহলে আপনার হাতে আর সময়টা কই?
আসুন, এবার একটু ভিন্ন এক হিসাব কষি। ১ থেকে ১৮ বছরের কথাই ধরুন, যখন স্কুলে পড়তেন, বাবা-মায়ের কাছেই ছিলেন প্রতিদিন। স্কুল শেষ করতে করতে আপনার বাবা-মায়ের বয়স গড়ে ৪০। অর্থাৎ, তাদের হাতে আর ৩০ বছর সময় আছে। এই ৩০ বছরে আপনার জীবনে আসবে আমূল পরিবর্তন—প্রিয় মানুষ, পড়াশোনা, চাকরি সহ জীবনের গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সবকিছুই। এ বয়সে অধিকাংশ মানুষই বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র পাড়ি জমায় পড়াশোনা কিংবা চাকরির উদ্দেশ্যে। যদি আপনিও ওই সময়টাতে বাড়ি ছাড়েন, তাহলে বাবা-মাকে দেখতে পাবেন কতদিন পর পর? ধরলাম, মাসে ৩ দিন। অর্থাৎ, বছরে ৩৬ দিন। তো যারা আপনাকে এই পৃথিবীতে এনেছে, সারা জীবনে তাদেরকে আর মাত্র ১,০৮০ দিন দেখতে পাবেন; যেখানে আপনি আগে প্রতিদিনই তাদের দেখতে পেতেন! অর্থাৎ, ১৮ বছর বয়সের মধ্যে আপনার বাবা-মায়ের সঙ্গে আপনি ৮৫ ভাগ সময় কাটিয়ে ফেলেছেন। এখন কেবলমাত্র আপনার কাছে ১৫ শতাংশ সময় অবশিষ্ট আছে। হিসেবটা কেমন ভয়ংকর রকমের অদ্ভুত, তাই না?
বিডিফেস২৪.কম-এর এই বিশেষ পর্যালোচনার মাধ্যমে আমরা আমাদের পাঠকদের কোনোভাবেই হতাশ করতে চাই না। আমরা একটুখানি বুঝাতে চেয়েছি যে, জীবন নিয়ে আমাদের কল্পনা-পরিকল্পনার যে শেষ নেই, তা আসলে অনেকটাই শুভংকরের ফাঁকি। জীবনটা হয়তো খুব ছোট মনে হচ্ছে, কিন্তু হলফ করে বলছি, সঠিক নিয়মে বাঁচলে এই সময়টাকেও আপনার কাছে অফুরন্ত মনে হবে। আপনি কিংবা আমি—যেই হই না কেন, সময় আমাদের কারোর জন্যই থেমে থাকে না। তাই সময়ের পুরোপুরি সদ্ব্যবহার করতে হবে। খাওয়া, ঘুম, লেখাপড়া—এ সময়গুলোকে আপনি চাইলেও এড়িয়ে যেতে পারবেন না। তবে মোবাইল ফোনের পেছনে ব্যয় করা সময়ের কথাই ধরুন, এই সময়টাতে যদি প্রতি সপ্তাহে অন্তত একটা নতুন দক্ষতা (Skill) শেখার পেছনে ব্যয় করেন, তাহলে বিষয়টা কেমন হয়?
এক সমীকরণে দেখা গেছে, পৃথিবীর প্রায় ৬৮ শতাংশ মানুষ তাদের চাকরি নিয়ে সন্তুষ্ট নন। অর্থাৎ, একবার যদি নিজের চাকরির ওপর আপনার অরুচি কাজ করা শুরু করে, তাহলে জীবনের ১০টি বছরই আপনার কাটবে নিরানন্দে। অপেক্ষায় থাকবেন কবে উইকেন্ড (ছুটির দিন) আসবে, নিজেকে একটু সময় দেবেন। তবে মানসিক চাপের মাঝে কখন যে ছুটির দিন আসবে আর কখন যে চলে যাবে, তা আপনি নিজেও টের পাবেন না। তাই এমন একটা পেশা বেছে নিন যেটাকে আপনি ভালোবেসে হাসিখুশি মনে করতে পারবেন। যদি ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে চাকরি করতেও হয়, তবে সে চাকরির মাঝেই ভালো লাগা তৈরি করুন।
যদি ভেবে থাকেন কর্মব্যস্ত জীবন শেষে অবসর নিয়ে নিজেকে একটু সময় দেবেন, হা হা! সে গুড়ে বালি। বিশ্বের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষই চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর বার্ধক্যজনিত রোগে আক্রান্ত হন। স্কুলে পড়ার সময় শিক্ষকের বকুনি আর পড়াশোনার চাপে পড়ে বলেছেন না—কলেজে উঠেই ভালো একটা সময় কাটাবেন? এরপর কলেজে গিয়ে আবারও হতাশায় ডুবে নিজেকে বুঝিয়েছেন—কর্মজীবনে গেলেই শান্তি। সেখানেও শান্তি না পেয়ে ভেবেছেন বিয়ে, বাচ্চা, সংসার, অবসর—আরও কত কী! কিন্তু সে সুখ নামের মরীচিকা আদেও ধরা দিয়েছে কি?
তাই যখন যা-ই কিছু করুন না কেন, সেটা নিজের মতো করে করুন। সবখুশির ভেতরেই ভালো লাগা তৈরি করুন। একবার চিন্তা করুন, আপনি আর মাত্র ৬ মাস বাঁচবেন; এখন আপনি কী করবেন? নিশ্চয়ই আপনি আপনার তৃপ্তিসহকারে পছন্দের সব খাবার খাবেন, নিজের প্রিয় মানুষ, পরিবার-পরিজন নিয়ে একটা ভালো সময় কাটাবেন, খারাপ কাজ থেকে দূরে থাকবেন এবং পরকালের জন্য প্রস্তুতি নেবেন।
তাই প্রতিটা দিন এমনভাবে বাঁচুন যেন কোনো আক্ষেপ না থাকে। নিজের ভেতর থেকে সকল নেতিবাচকতা দূর করে সৃষ্টিকর্তার তরে নিজেকে সঁপে দিন। সময়ের মূল্য দিন, জীবন সুখের হবে। নতুবা সুখ নামের অধরা মরীচিকার পিছে ছুটতে ছুটতে কখন যে হঠাৎ মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে এসে পড়বেন, টেরই পাবেন না। জীবনের কতটুকু অংশ আসলে আপনার? জীবন শুরু হবার আগেই তো শেষ! তাই জেগে উঠুন, জীবন অনেক ছোট।
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more