প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: অক্টোবর ১২, ২০২৬, ৪:০৯ এ.এম
আমাদের প্রতিদিনের অনুভূতি ও মননে রবীন্দ্রনাথ
অ-অ+
অনলাইন ডেস্ক:
সকালের প্রথম সূর্য ওঠা থেকে শুরু করে রাতের নিরবতায় ঘুমোতে যাওয়া পর্যন্ত—আমাদের মনোজগতের এক বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি কেবল প্রথাগত একজন কবি বা কথাসাহিত্যিক নন; বরং আমাদের আনন্দ, প্রেম, বিরহ, নিঃসঙ্গতা, প্রকৃতির সান্নিধ্য কিংবা সামাজিক ও জাতীয় সংকটে অনুভূতির ভাষা খোঁজার এক অনন্য আশ্রয়। জীবনের সূক্ষ্মতম আবেগগুলোকে যখন কথায় প্রকাশ করা কঠিন হয়ে পড়ে, তখন না চাইতেও তাঁর সৃষ্টির শরণাপন্ন হতে হয়।
সম্প্রতি রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতি বা দেয়ালচিত্রে কালি মাখানোর মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা তাঁর প্রাসঙ্গিকতা ও আমাদের সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় নিয়ে নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। কেউ কেউ তাঁকে কেবল ‘ভারতীয় কবি’ আখ্যা দিয়ে দূরে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করেন। অথচ ঐতিহাসিক সত্য হলো, অবিভক্ত ভারতের বাঙালি কবি হিসেবে শিলাইদহ, শাহজাদপুর ও পতিসরে জমিদারি তদারকির সুবাদে এই ভূখণ্ডের মাটির সঙ্গে তাঁর গভীর আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। এই অঞ্চলের নদী, গ্রামীণ জীবন ও সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ তাঁর গল্প, কবিতা ও চিঠিপত্রে জীবন্ত হয়ে আছে। তদুপরি, বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা’ তাঁরই রচনা—যা রাজনৈতিক মানচিত্রের সীমানা ছাড়িয়ে আমাদের সাংস্কৃতিক ও জাতীয় সত্তার মূল ভিত্তি গড়ে দিয়েছে।
তাছাড়া, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময় রবীন্দ্রনাথ বিরোধিতা করেছিলেন—এমন একটি প্রচলিত ধারণাও নানা আলোচনায় উঠে আসে। কিন্তু বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস ও প্রামাণ্য দলিলের দিক থেকে এই দাবির পক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য ভিত্তি পাওয়া যায় না। আবেগ বা তথ্যহীন বিদ্বেষ দিয়ে ইতিহাস চর্চা করা যায় না; ঐতিহাসিক মূল্যায়নের ভিত্তি হতে হবে স্পষ্ট প্রমাণ, দলিল ও যুক্তি। একজন লেখকের জন্মস্থান বা অবস্থানকে অজুহাত বানিয়ে তাঁর অমর সৃষ্টিকে প্রত্যাখ্যান করা জ্ঞানচর্চা কিংবা সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাসের পরিচয় বহন করে না।
বর্তমানের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদী দর্শন অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। যখন সমাজে অসহিষ্ণুতা ও হিংসা রূপ নেয় এবং মানুষ একে অপরের প্রতি আস্থা হারাতে বসে, তখন রবীন্দ্রনাথের 'সভ্যতার সংকট' প্রবন্ধের শিক্ষা আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়। অন্যায়ের মধ্যেও মানুষের ভেতরকার শুভবুদ্ধির ওপর বিশ্বাস রাখার আহ্বান তিনি জানিয়ে গেছেন। একইভাবে, 'চিত্ত যেথা ভয়শূন্য' কবিতায় মুক্ত চিন্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ভীতিহীন সমাজ গড়ার যে স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, তা যেকোনো সভ্য সমাজের মূল চালিকাশক্তি।
কোনো লেখকের চিন্তাধারা বা সাহিত্য নিয়ে দ্বিমত কিংবা গঠনমূলক সমালোচনা থাকতেই পারে, কিন্তু প্রতিকৃতিতে কালি মেখে বা বিদ্বেষ ছড়িয়ে তাঁর সাহিত্যমূল্য খণ্ডন করা অসম্ভব। এতে বরং সমাজের জ্ঞানচর্চার দুর্বলতাই ফুটে ওঠে। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য আমাদের অন্ধ আনুগত্য শেখায় না; বরং প্রশ্ন করতে, যুক্তি দিয়ে বুঝতে এবং মানুষের মর্যাদাকে মূল্য দিতে শেখায়। দেয়ালে আঁকা কোনো ছবিতে কালি মাখিয়ে তাঁর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করা গেলেও, মানুষের হৃদয়ে ও চিন্তায় ছড়িয়ে থাকা তাঁর সৃষ্টির আলো কখনো নেভানো সম্ভব নয়। তাই রবীন্দ্রচর্চা কেবল মঞ্চে গান গাওয়া বা আবৃত্তির বিষয় নয়—তাঁর উদারতা, যুক্তি ও মানবতাবোধকে দৈনন্দিন জীবন ও চিন্তায় লালন করাই হলো তাঁকে ধারণ করার আসল পথ।
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more