শিক্ষার আড়ালে হাজার কোটি টাকার কোচিং বাণিজ্য: আমাদের ভবিষ্যৎ কোন পথে?
Date: 2026-07-18
প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: জুলাই ১৮, ২০২৬, ৬:১৫ এ.এম
শিক্ষার আড়ালে হাজার কোটি টাকার কোচিং বাণিজ্য: আমাদের ভবিষ্যৎ কোন পথে?
অ-অ+
বিডিফেস ২৪-এর বিশেষ আয়োজন :
আমাদের চারপাশে এমন অনেক ছাত্র বা ছাত্রী রয়েছে, যারা স্কুল ও কোচিংয়ের টানা পড়ালেখা শেষ করে ক্লান্ত শরীরে বাড়ি ফেরে। স্কুলের পড়াশোনা অসম্পূর্ণ থেকে যায় বলে মা-বাবার চাপ আর পিছিয়ে পড়ার ভয়ে আজ আমাদের সমাজের অগণিত কিশোর-কিশোরী বাধ্য হয়েই এই কোচিং সংস্কৃতিকে মেনে নিচ্ছে। স্কুল বা কলেজের রেগুলার ক্লাসের বাইরে কোচিং করে না বা প্রাইভেট পড়ে না—এমন শিক্ষার্থী খুঁজে পাওয়ার চাইতে খড়ের গাদায় সুচ খোঁজা ঢের সহজ কাজ। কোচিং করা বা প্রাইভেট পড়া রীতিমতো এক ট্রেন্ডে পরিণত হয়েছে আমাদের সমাজে।
শিক্ষাবিষয়ক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এডুকেশনাল কমিউনিকেশন বা ‘ইসি’র ২০১৭ সালের হিসাব মতে, দেশের প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের প্রায় ৭৭.০৯% শিক্ষার্থী কোনো না কোনোভাবে মূল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বাইরে অর্থের বিনিময়ে কোচিং নিচ্ছে। তাদের মতে, দেশজুড়ে ছোট-বড় মিলিয়ে কোচিং কেন্দ্র রয়েছে প্রায় পৌনে দুই লাখ। আর এখানে-সেখানে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা এসব কোচিং কেন্দ্রগুলোতে বাৎসরিক আর্থিক লেনদেনের পরিমাণ ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকা! শিক্ষাকে পুঁজি করে এই হাজার হাজার কোটি টাকার বাণিজ্যের আদ্যোপান্ত তুলে ধরাই বিডিফেস ২৪-এর আজকের বিশেষ আয়োজন; এই বিষয় নিয়েই সাজানো হয়েছে আমাদের আজকের নিবন্ধ।
মানব সৃষ্টির সূচনা থেকেই মানুষের জ্ঞান অর্জনের প্রচেষ্টা শুরু। কিন্তু মানব বসতির শুরুতে মানুষের সংখ্যা ছিল খুবই কম এবং তখন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও ছিল না। মানুষের কাছ থেকেই মানুষ শিখত এবং একজন যা জানত, তা অপরজনকে শেখাত। তখন প্রত্যেকেই ছিল শিক্ষক ও প্রত্যেকেই ছাত্র। সময়ের সাথে সাথে পৃথিবীতে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পায়, আর মানুষ পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। কালের পরিক্রমায় জ্ঞান অর্জনের জন্য দেশে দেশে গড়ে উঠতে শুরু করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। তারই ধারাবাহিকতায়, জ্ঞান অর্জনের জন্য আজ বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে হাজারও স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়। গবেষণার জন্য প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে আরও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষা অর্জনের প্রধান মাধ্যম হলেও, আজকাল এসবের বাইরে যেখানে-সেখানে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন কোচিং কেন্দ্র।
খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, কয়েক দশক আগেও স্কুল-কলেজের শিক্ষকরাই কেবল প্রাইভেট পড়াতেন, এর বাইরে তেমন কোনো কোচিং কেন্দ্র ছিল না। কিন্তু এখন স্কুল-কলেজের শিক্ষকের বাইরে অনেকেই কোচিং কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছেন। অনেক উচ্চশিক্ষিত যুবক এখন কোচিং কেন্দ্র পরিচালনাকেই পেশা হিসেবে নিয়েছে। স্কুল-কলেজের বিভিন্ন ক্লাসের শিক্ষার্থীরা দল বেঁধে এসব কোচিং কেন্দ্রে ভর্তি হয়। সেখানে ক্লাস করে এবং পরীক্ষা পাসের প্রস্তুতি নেয়। উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা শেষে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি কোচিং থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজের বিভিন্ন ক্লাসের একাডেমিক কোচিং, বিসিএস, ব্যাংক চাকরি ও অন্যান্য চাকরির কোচিং, আইইএলটিএস, জিআরই প্রিপারেশন কোচিং—সবই আছে এখানে। আর থাকবে নাই-বা কেন! কোচিং কেন্দ্রের চাহিদা তো অনেক। ঘরে ঘরে শিক্ষার্থী আজ কোচিংমুখী। কিন্তু কেন এই হাল? কেন কোচিংয়ের দিকে এত বেশি ঝুঁকছে শিক্ষার্থীরা? এই প্রশ্নের উত্তর কম-বেশি সবারই জানা। একজন শিক্ষার্থীকে জিজ্ঞেস করলে উত্তর আসে—‘স্কুল-কলেজে ভালো ক্লাস হয় না, স্যার ক্লাসে কী পড়ান তা ঠিকমতো বুঝতেই পারি না’। আর অভিভাবকরা এক ধরনের সামাজিক প্রতিযোগিতার কারণে ভাবেন—‘অমুকের ছেলে কোচিং করে, তমুকের মেয়ে ব্যাচে যায়; আমার সন্তানকে না দিই কীভাবে?’
মূলত কোচিং ব্যবসায়ীরা অত্যন্ত সফলভাবে এদেশের অভিভাবকদের বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন যে, স্কুল-কলেজের লেখাপড়া পরিপূর্ণ নয়, এর সঙ্গে যেভাবে হোক, যতখানি সম্ভব কোচিংয়ের স্পর্শ থাকতে হবে। এখন অভিভাবকরা এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। যেহেতু সবার ছেলে-মেয়ে কোচিং করছে, তাই যদি নিজের ছেলে-মেয়েদের কোচিং করতে দেওয়া না হয়, তাহলে যেন কোনো এক ধরনের অপরাধ করা হয়ে যাবে। সেই অপরাধের কারণে তাদের ছেলে-মেয়েদের কোনো একটা ক্ষতি হয়ে গেলে, তারা কখনোই নিজেদের ক্ষমা করতে পারবেন না। সেজন্য ভালো হচ্ছে না মন্দ হচ্ছে, সেটা নিয়ে তারা মাথা ঘামান না। নিজের ছেলে-মেয়েদের চোখ বন্ধ করে কোচিং করতে পাঠিয়ে দিচ্ছেন তারা। অথচ এই শিক্ষার্থীরা যদি একটুখানি সাহস করে কোনো কোচিং ব্যবসায়ীর কাছে না গিয়ে নিজেরা নিজেদের পড়া করত, তাহলে হয়তো তাদের জীবনটা হতো অন্যরকম. তাদের ভেতর এক ধরনের আত্মবিশ্বাসের জন্ম হতো। লেখাপড়া করার বাইরে তাদের প্রচুর সময় থাকত, যে সময়টিতে তারা গল্পের বই পড়তে পারত, ছবি আঁকতে পারত, গান গাইতে পারত, বন্ধুদের সঙ্গে মাঠে ফুটবল খেলতে পারত। এখন তারা স্কুল শেষে এক কোচিং থেকে অন্য কোচিংয়ে ছুটে যায়। তাদের জীবনে বিন্দুমাত্র অবসর নেই।
লেখাপড়ার একটা বড় উদ্দেশ্য হচ্ছে শেখা, কাজেই আমরা সবাই চাই আমাদের ছেলে-মেয়েরা শিখুক। কিন্তু একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার আমরা প্রায়ই ভুলে যাই—কী শিখছে তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে ‘কিভাবে’ শিখছে। কারণ, একজনকে কোচিং করিয়ে কিছু একটা শিখিয়ে দেওয়া হয়তো সম্ভব, কিন্তু একবার শিখলেই তো বিষয়টা শেষ হয়ে যায় না। একজন মানুষকে সারা জীবন শিখতে হয়, কাজেই যে নিজে নিজে শিখতে পারে, সে সারাটা জীবন শিখতে পারবে। একটা কথা আছে—কাউকে একটা মাছ কিনে দিলে সে সেই দিনই মাছ খেতে পারে, কিন্তু তাকে মাছ ধরা শিখিয়ে দিলে সে সারাটা জীবন মাছ ধরে খেতে পারবে। শেখার বেলাতেও এটাই সত্যি। কোচিং করে কাউকে কিছু একটা শিখিয়ে দিলে সে বিষয়টি শিখতে পারে, কিন্তু কিভাবে শিখতে হয় সেটা জানিয়ে দিলে সে সারাটা জীবন শিখতে পারত। কিন্তু আমাদের কোচিং কেন্দ্রগুলোতে বিভিন্ন নোট, শিট, টোটকা বানিয়ে রেডিমেড গিলিয়ে দিচ্ছে শিক্ষার্থীদের। সেইসব পরীক্ষার খাতায় উগরে দিয়ে শিক্ষার্থীরা ভালো ফল করছে ঠিকই, কিন্তু তারা হয়ে পড়ছে পরনির্ভর।
কিন্তু এমনটা কি আমরা চাই? আমরা তো চাই আমাদের ছেলে-মেয়েদের ভেতর সেই আত্মবিশ্বাসটুকু গড়ে উঠুক যে, কোনো রকম কোচিং ছাড়া তারা নিজেরাই নতুন কিছু শিখতে পারবে। তথ্যপ্রযুক্তি, অটোমেশন বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের এই যুগে খুবই দ্রুত এগুলো পৃথিবীর মানুষের জায়গা দখল করে নিতে থাকবে। আমরা চাই আমাদের দেশের ছেলে-মেয়েগুলো আত্মবিশ্বাসী সৃজনশীল মানুষ হিসেবে বড় হোক; ভবিষ্যতের পৃথিবীতে কোনো একটা যন্ত্র এসে যেন তাদের অপ্রয়োজনীয় করে ফেলতে না পারে।
এছাড়াও কোচিং বাণিজ্যের অবাধ প্রসারের ফলে প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটছে অহরহ। এর প্রতিকার স্বরূপ এখন কোনো পাবলিক পরীক্ষার আগে সকল কোচিং কেন্দ্র বন্ধ রাখা হয়, তবুও প্রশ্ন ফাঁস পুরোপুরি ঠেকানো যাচ্ছে না। অনেক কোচিং কেন্দ্রে সন্তানকে ভর্তি করাতে অভিভাবককে গুনতে হয় চড়া অঙ্কের অর্থ, যা সমাজের নিম্ন আয়ের লোকদের জন্য অসম্ভবই বলা চলে। এভাবে শিক্ষার মতো একটি মৌলিক চাহিদাতেও বৈষম্যের ছাপ প্রকট করে তুলে ধরেছে কোচিং ব্যবসা। অনেক স্কুল-কলেজের অসাধু শিক্ষক তার ব্যাচ বা কোচিংয়ে না পড়লে শিক্ষার্থীদের অহেতুক হয়রানি করে থাকেন, ইচ্ছাকৃতভাবে নম্বর কমিয়ে দেন।
কোচিং খারাপ তা না হয় মেনে নিলাম, কিন্তু স্কুল-কলেজে ঠিকমতো পড়াশোনা হয় না এটা তো সত্যি? হ্যাঁ, তা মানছি, অনেক স্কুল-কলেজেই তা হয় না। কিন্তু কোচিং কেন্দ্র এই সমস্যার তো সমাধান নয়, বরং এই কোচিং সংস্কৃতি আমাদের স্কুল-কলেজের এই দুরবস্থার জন্য প্রত্যক্ষভাবে দায়ী। কোচিং বাণিজ্য বলতে কিছুই যদি না থাকত, তাহলে স্কুল-কলেজের পড়াশোনার মান খানিকটা হলেও বাড়ত। শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিচ থেকে শিখতে চাওয়ার প্রবণতা বাড়ত। কিন্তু তা হচ্ছেটা কই? আর কোভিড-পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় যে বিরাট এক ছেদ পড়েছে, তাতে খুব শিগগিরই এ অবস্থা থেকে উত্তরণ হবে—এমনটা আশা করা কঠিন বলেই মনে করে বিডিফেস ২৪।
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more