সেনাসদস্য থেকে বৈশ্বিক মার্কেটপ্লেসের শীর্ষ ফ্রিল্যান্সার
Date: 2026-07-14
প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: জুলাই ১৪, ২০২৬, ১:৪৬ পি.এম
সেনাসদস্য থেকে বৈশ্বিক মার্কেটপ্লেসের শীর্ষ ফ্রিল্যান্সার
অ-অ+
অনলাইন ডেস্ক:
জীবন কখনো কখনো সব চেনা ছক ও সমীকরণ বদলে দেয়। তেমনই এক অবিশ্বাস্য পরিবর্তনের গল্প গড়েছেন বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জের তরুণ মুহাইমিনুল ইসলাম। একসময় যাঁর পরিবারের একমাত্র নির্ভরতা ছিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১৬ হাজার টাকা বেতনের একটি সরকারি চাকরি, আজ তিনি বৈশ্বিক ফ্রিল্যান্সিং বাজারে এক পরিচিত নাম। মাত্র আড়াই বছরের ব্যবধানে অনলাইন মার্কেটপ্লেস ‘আপওয়ার্ক’-এ তাঁর মোট আয় ছুঁয়েছে প্রায় ১ লাখ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় কোটির টাকারও বেশি! বর্তমানে প্রতি মাসে তিনি আয় করছেন প্রায় ৩ লাখ টাকা।
স্বপ্নের ভাঙা-গড়া ও সেনাজীবন বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জের এ সি লাহা পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ২০১৬ সালে এসএসসি পাস করেন মুহাইমিনুল। বাবা মো. সোহরাব হোসেন পাহলান ছিলেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং মা কহিনুর বেগম গৃহিণী। চার বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে সবার ছোট মুহাইমিনুল খুলনা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ডিপ্লোমা প্রকৌশলে ভর্তি হয়ে প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্ন দেখছিলেন। কিন্তু নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের টানাপোড়েনে ২০১৮ সালে চতুর্থ সেমিস্টারে থাকাকালীনই হাল ধরতে যোগ দেন সেনাবাহিনীর মাঠে। প্রথমবারেই বাজিমাত করেন তিনি। ২০১৯ সালের প্রশিক্ষণে ১ হাজার ১৫২ জনের মধ্যে ১৬তম স্থান অর্জন করে ২০২০ সালে বগুড়ায় ইউনিটে যোগ দেন।
ঝুঁকি ও জীবনসঙ্গীর নিঃশর্ত সমর্থন সরকারি চাকরির নিশ্চিত জীবন ও নিয়মিত বেতন থাকা সত্ত্বেও বাঁধাধরা জীবন টানেনি মুহাইমিনুলকে। ফলে ২০২২ সালের শেষভাগে কোনো পূর্বপরিকল্পনা ছাড়াই চাকরি ছেড়ে দেওয়ার এক চরম ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষের এমন সিদ্ধান্তে চারদিকে যখন ঘোর অনিশ্চয়তা, তখন তাঁর পাশে এসে দাঁড়ান স্ত্রী ইসরাত জাহান। মুহাইমিনুল কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, "সেদিন আমার স্ত্রী ইসরাত যদি রাজি না হতো, তবে আজকের এই গল্পটা হয়তো কোনো দিনই বলা হতো না।" কম্পিউটার অন-অফ না জানা থেকে ‘টপ রেটেড প্লাস’ চাকরি ছেড়ে বাড়ি ফেরার পর এক দুলাভাইয়ের কাছে প্রথম ‘ফ্রিল্যান্সিং’ শব্দটি শোনেন মুহাইমিনুল। তখন তাঁর প্রযুক্তিগত জ্ঞান এতটাই শূন্য ছিল যে, কম্পিউটারের পাওয়ার বাটন চেপে কীভাবে অন-অফ করতে হয়, তাও তিনি জানতেন না। তবে হার না মানা মানসিকতা নিয়ে সেনাবাহিনীর জমানো টাকা দিয়ে একটি পুরোনো ল্যাপটপ কেনেন। ইউটিউব দেখে কপি-পেস্ট ও বেসিক কাজ শেখার পর দুলাভাইয়ের সহযোগিতায় শুরু করেন ওয়েব ডিজাইন।
পরবর্তীতে ২০২৩ সালে সার্চ ইঞ্জিন অপ্টিমাইজেশন (SEO) বিষয়ের প্রতি তাঁর তুমুল আগ্রহ তৈরি হয়, যা তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ২০২৪ সালের জুন থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে পুরোদমে কাজ শুরু করার পর আর পেছনে তাকাতে হয়নি তাঁকে। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে নিজের মেধা ও একাগ্রতার জোরে আপওয়ার্কে অর্জন করেন সম্মানজনক ‘টপ রেটেড’ এবং পরবর্তীতে ‘টপ রেটেড প্লাস’ ব্যাজ। শুধু ফ্রিল্যান্সিংই নয়, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি নামকরা মার্কেটিং এজেন্সিতে ‘এসইও স্ট্র্যাটেজিস্ট’ হিসেবেও কাজ করছেন তিনি। আপওয়ার্ক থেকেই তাঁর আয় ছাড়িয়েছে ৫০ হাজার ডলার।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও ‘ফ্লাস্ক এসইও’ সাফল্যের এই আলোঝলমলে সময়ে ২০২৫ সালের ১১ নভেম্বর মুহাইমিনুল তাঁর বাবাকে হারান। বাবার এই চলে যাওয়া তাঁর জীবনের এক অপূরণীয় ক্ষতি হলেও, বাবার স্বপ্নকে বুকে ধারণ করে সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন তিনি। শুরুতে পরিবারের অসম্মতি থাকলেও এখন মা ও আত্মীয়স্বজনরা তাঁকে নিয়ে গর্ব করেন।
একদিন যে তরুণ ১৬ হাজার টাকার বেতনের জন্য দিনরাত পরিশ্রম করতেন, আজ তিনি নিজেই কর্মসংস্থান তৈরি করছেন অন্যদের জন্য। নিজের কাছের কিছু বন্ধু ও ছোট ভাইদের নিয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন ‘ফ্লাস্ক এসইও’ (Flask SEO) নামের একটি শক্তিশালী দল। এই দলের মাধ্যমে দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে আরও এগিয়ে নেওয়ার এবং বৈশ্বিক বাজারে বড় কিছু করার স্বপ্ন দেখছেন মোরেলগঞ্জের এই সফল স্বপ্নসারথি।
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more