প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: জুলাই ২২, ২০২৬, ১:৫৬ পি.এম
ডিপ ফেক: প্রযুক্তির এক ভয়ঙ্কর কালো অধ্যায়
অ-অ+
নিজস্ব প্রতিবেদক | বিডিফেস২৪:
বর্তমান যুগে প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে যেমন সহজ করে দিয়েছে, তেমনি এর অপব্যবহার ডেকে আনছে ভয়াবহ সংকট। এর একটি বড় উদাহরণ হলো 'ডিপ ফেক' বা কৃত্রিম উপায়ে তৈরি ভুয়া ভিডিও-অডিও ক্লিপ, যা দেখে বাস্তবের সঙ্গে কোনো তফাত করা যায় না।
২০২২ সালের জুন মাসে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, অভিনেতা শাহরুখ খান ভারতের বিভিন্ন এলাকার ছোট ছোট মোদি দোকানের প্রমোশন করছেন। এগুলো সম্ভব হয়েছে মেশিন লার্নিং, গভীর ডাটা বিশ্লেষণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং ডিপ ফেকের বদৌলতে। বর্তমান প্রযুক্তির এক ভয়ঙ্কর কালো অধ্যায় হলো এই ডিপ ফেক।
ডিপ ফেক মূলত এমন সব ভিডিও, যা দেখে বাস্তব মনে হলেও আদতে এর সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই। বর্তমানে বেশ কিছু সুপরিচিত সফটওয়্যার, ওয়েবসাইট কিংবা এআই টুলস রয়েছে, যেগুলো ব্যবহার করে এ ধরনের বিশ্বাসযোগ্য ও ভয়ঙ্কর মিথ্যা অডিও বা ভিডিও ক্লিপ তৈরি করা অত্যন্ত সহজ হয়ে গেছে। কোনো ব্যক্তির ছবির সঙ্গে অন্য একটি ভিডিও জুড়ে দিয়ে মুহূর্তেই তৈরি করা যায় সুপরিকল্পিত ডিপ ফেক ভিডিও। এই ভিডিওগুলো এতটাই বাস্তবসম্মত হয় যে, সাধারণ মানুষের পক্ষে তা শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব।
বর্তমানে এই প্রযুক্তি এতটাই বিকশিত হয়েছে যে, এর ক্ষতিকর প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায়। এতদিন সেলিব্রিটি ও রাজনৈতিক ব্যক্তিরা এর শিকার হলেও, সাম্প্রতিক সময়ে সাধারণ মানুষের জীবনেও এর মারাত্মক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে, যা সকলের জন্য এক আতঙ্কের বিষয়। এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে যেকোনো ছবি থেকে নিমিষেই পোশাক পরিবর্তন করে আপত্তিকর বা বিবস্ত্র ছবি তৈরি করা এখন মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যাপার। ছবিগুলো এতটাই নিখুঁত হয় যে, কোনটা আসল আর কোনটা নকল তা বোঝার কোনো উপায় থাকে না।
মিডজার্নির মতো বহুল পরিচিত এআই টুলস ডিপ ফেককে এক নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাজনীতিসহ নানা সেক্টর আজ এই অপপ্রকৌশলে আক্রান্ত। ২০১৮ সালে ডিপ ফেক প্রযুক্তির বিষয়টি পুরোপুরি সামনে আসে। তবে রাজনীতিতে নয়, এর প্রথম ব্যবহার হয়েছিল পর্নোগ্রাফি জগতে। চেনা তারকার মুখ কারিগরি কৌশলে পর্নদৃশ্যে অভিনয় করা কোনো দেহের সঙ্গে এমনভাবে জুড়ে দেওয়া হতো যে বোঝার উপায় থাকত না। দেলোয়ার হোসেন সাইদীর রায়ের পর চাঁদে সাইদীর ছবি অপপ্রচারের মাধ্যমে বিভ্রান্তি সৃষ্টির ঘটনাটি ফটোশপ দিয়ে এডিট করা হলেও, ডিপ ফেক ফটোশপের চেয়ে হাজার গুণ বেশি শক্তিশালী। কারণ ফটোশপ কেবল ছবি তৈরিতে সীমাবদ্ধ থাকলেও, ডিপ ফেক দিয়ে নিখুঁত অডিও ও ভিডিও ফুটেজ তৈরি করা সম্ভব। সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে অপব্যবহারের মাধ্যমে জন্ম নেওয়া এই মাধ্যমকে বলা হয় 'সিন্থেটিক মিডিয়া'।
দিন যত যাচ্ছে, নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের ফলে সোশ্যাল মিডিয়া ভুয়া তথ্যে সয়লাব হয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর নওরীন আফরোজ প্রিয়ার একটি আপত্তিকর ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ে। আপাতদৃষ্টিতে ভিডিওটি স্বাভাবিক মনে হলেও সেটি যে সম্পূর্ণ ফেক, তা শনাক্ত করা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম 'দ্য গার্ডিয়ান'-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে অনলাইনে ১৫ হাজার ডিপ ফেক ভিডিও পাওয়া গেছে, যা নয় মাসের মধ্যে প্রায় দ্বিগুণ। এর মধ্যে ৯৬ শতাংশই পর্নোগ্রাফিক ভিডিও এবং এর ৯৯ শতাংশই নারী সেলিব্রিটি ও তারকাদের চেহারা ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে পরিবর্তিত করা। ক্যাটরিনা কাইফ, প্রিয়াঙ্কা চোপড়া, দিশা পাটানি, নেহা শর্মা, রাশমিকা মান্দানাসহ অসংখ্য তারকা এর শিকার হয়েছেন।
বলিউডের অভিনেতা ঋত্বিক রোশন ভিন্ন ভিন্ন মানুষের নাম নিয়ে রাখি বন্ধনের শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন—এমন ভিডিও বা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের তিন সপ্তাহ পর ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি তার সৈন্যদের আত্মসমর্পণ করার ডাক দিচ্ছেন—এমন ভিডিওগুলো ডিপ ফেক প্রযুক্তিরই ফল। প্রথম ভিডিওটি বিনোদনমূলক মনে হলেও দ্বিতীয়টি ছিল অত্যন্ত বিপজ্জনক ও ভূরাজনৈতিক সংকট তৈরির মতো।
ডিপ ফেকের ব্যবহার এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়লেও সব দেশের প্রচলিত আইনে এর সুনির্দিষ্ট বিধান নেই। তবে চীন এ বিষয়ে কড়া অবস্থান নিয়েছে এবং ডিপ ফেক ব্যবহার করে তৈরি ভুয়া খবর অবৈধ ঘোষণা করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় সব রাজ্যেই ডিপ ফেক পর্ন সম্পর্কিত কঠোর আইন রয়েছে।
প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে, ডিপ ফেক শনাক্ত করা ততটাই কঠিন হয়ে পড়ছে। ২০১৮ সালে গবেষকরা দেখেন, ডিপ ফেক ভিডিওতে মানুষের চোখের পলক পড়ে না, কারণ এর উৎস ছবিগুলোতে চোখ খোলা থাকে। তবে পরবর্তীতে এই দুর্বলতাও কাটিয়ে উঠেছে ডিপ ফেক তৈরিকারীরা। বর্তমানে নিম্নমানের ডিপ ফেক শনাক্ত করা সহজ হলেও, দক্ষ হাতে তৈরি ভিডিও শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন। মাইক্রোসফট, ফেসবুক এবং অ্যামাজনের মতো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো ডিপ ফেক শনাক্তকরণ নিয়ে বিভিন্ন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে থাকে।
ডিপ ফেকের নেতিবাচক ব্যবহার এখন মানুষের মাথাব্যথার মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষের কণ্ঠ হুবহু নকল করে তৈরি হচ্ছে 'ডিপ ফেক কল' বা এআই বেসড স্ক্যাম কল। উদাহরণস্বরূপ—আপনার সন্তান বিদেশে বেড়াতে গেল, আর হঠাৎ অচেনা এক নম্বর থেকে ফোন এল যেখানে আপনার সন্তানের কান্নার কণ্ঠস্বর বলে উঠল, "আমি বিপদে পড়েছি, আমাকে এখনই এই ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ১০ লাখ টাকা পাঠাও।" দিশাহারা হয়ে অনেক সময় স্বজনরা কোনো যাচাই ছাড়াই টাকা পাঠিয়ে দেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন মাত্র তিন থেকে চার সেকেন্ডের ভিডিও বা কয়েকটি শব্দ থেকেই কণ্ঠস্বর নিখুঁতভাবে নকল করে দীর্ঘ কথোপকথন চালিয়ে যেতে পারে।
যাঁরা এই ডিপ ফেকের শিকার হন, তাঁদের সামাজিক ও মানসিক অবস্থা চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। চোখের সামনে নিজের ভুয়া বা আপত্তিকর ভিডিও ঘুরে বেড়াতে দেখে অনেক ভুক্তভোগী তীব্র ট্রমা বা মানসিক অবসাদে ভুগে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। প্রযুক্তি সবেমাত্র তার যাত্রা শুরু করেছে। এর নেপথ্যের ভয়াবহতা এবং অপব্যবহার মানবজাতিকে সামনে কোথায় নিয়ে দাঁড় করায়, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়।
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more