২০১৯ সালে বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে প্রকাশ্যে শাহনেওয়াজ রিফাত শরীফকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা পুরো দেশকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সিসিটিভি ফুটেজে স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিকে স্বামীকে বাঁচানোর চেষ্টা করতে দেখা গেলেও, পরবর্তীতে গভীর তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় উঠে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। স্বামীকে বাঁচানোর আকুতি ছিল মূলত একটি সাজানো নাটক এবং পুরো হত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড ছিলেন স্বয়ং মিন্নি।
বরগুনা সদরের বড় লবণগোলা গ্রামের দুলাল শরীফের ছেলে রিফাত শরীফ এবং মোজাম্মেল হোসেন শিকারীর মেয়ে আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নির মধ্যে ২০১৭ সালে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তখন মিন্নি বরগুনা আইডিয়াল কলেজে এবং রিফাত বরগুনা বামনা সরকারি কলেজে পড়াশোনা করতেন। পরিচিত বন্ধুদের মাধ্যমে ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যোগাযোগের সূত্র ধরে তাদের ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তবে রিফাতের মাধ্যমেই মিন্নির পরিচয় হয় বরগুনার আলোচিত সন্ত্রাসী গ্যাং ‘বন্ড ০০৭’-এর নেতা সাব্বির আহমেদ নয়ন ওরফে ‘নয়ন বন্ড’-এর সাথে। নয়নের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসা, ছিনতাই ও চাঁদাবাজিসহ বরগুনা থানায় অন্তত আটটি মামলা ছিল।
২০১৮ সালের ১৫ ডিসেম্বর বিকেলে নয়ন বন্ডের বাসায় এক কাজী ডেকে গোপনে মিন্নির সাথে নয়নের বিয়ে সম্পন্ন হয়। বিয়েটি গোপন রাখার শর্তে তাদের সম্পর্ক চলতে থাকলেও পরবর্তীতে একটি মামলায় নয়ন জেলে গেলে মিন্নি তার থেকে দূরত্ব তৈরি করেন এবং পুনরায় রিফাত শরীফের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। ২০১৯ সালের ২৬ এপ্রিল নয়ন জেলে থাকা অবস্থাতেই পারিবারিকভাবে রিফাত শরীফের সাথে মিন্নির বিয়ে হয়। নয়ন জেল থেকে জামিনে বের হওয়ার পর মিন্নি দুইজনের সাথেই যোগাযোগ বজায় রেখেছিলেন। কিন্তু রিফাত শরীফ মিন্নির সাথে নয়ন বন্ডের সম্পর্কের কথা জেনে ফেললে দম্পতির মধ্যে চরম কলহ তৈরি হয় এবং রিফাত মিন্নিকে মারধর করেন।
হত্যাকাণ্ডের আগের ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০১৯ সালের ২৪ জুন দুপুরে নয়ন বন্ডের জন্মদিনের অনুষ্ঠানের জেরে রিফাত শরীফ নয়নের বন্ধু হেলালের মোবাইল ফোন কেড়ে নেন। ফোন ফেরত পেতে নয়ন বন্ড ও তার ডানহাত রিফাত ফরাজি মিন্নিকে ফোন দিলে মিন্নি বিষয়টি রিফাতকে জানান। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে রিফাত মিন্নিকে আবারও মারধর করেন। মিন্নি কান্নাকাটি করে নয়ন বন্ডকে ফোন দিলে নয়ন তাকে পরদিন দেখা করতে বলেন। পরদিন ২৫ জুন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে মিন্নি কলেজে যাওয়ার কথা বলে নয়ন বন্ডের বাসায় গিয়ে প্রায় দেড় ঘণ্টা অবস্থান করেন এবং সেখানে রিফাত শরীফকে শিক্ষা দেওয়ার সিদ্ধান্ত ও চূড়ান্ত পরিকল্পনা করা হয়।
ঘটনার দিন অর্থাৎ ২০১৯ সালের ২৬ জুন সকাল ১০টায় মিন্নি কলেজে যান এবং রিফাত শরীফকে তাকে কলেজ থেকে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার জন্য কল করে আসতে বলেন। সকাল ১০টা ৩ মিনিটে রিফাত ফরাজি তার সহযোগীদের নিয়ে কলেজের সামনে অ্যালেক্স একাডেমির কাছে অবস্থান নেয় এবং ১০টা ১০ মিনিটে দুজনকে কৌশলগত অবস্থানে পাঠায়। সকাল ১০টা ১২ মিনিটে রিফাত শরীফ মোটরসাইকেল নিয়ে এসে মিন্নিকে নিয়ে বের হতে চান, কিন্তু নয়ন বন্ডের গ্যাং তখনও পুরোপুরি প্রস্তুত না থাকায় মিন্নি অজুহাত দেখিয়ে পুনরায় কলেজের ভেতরে ঢুকে পড়েন। এরপরই রিফাত ফরাজি ও তার সহযোগীরা রিফাত শরীফকে ধরে নয়ন বন্ডের দিকে টেনে নিয়ে যায়। রিফাত ফরাজি দুটি রামদা নিয়ে এসে একটি নয়ন বন্ডকে দেয় এবং দুজনে মিলে রিফাতকে এলোপাতাড়ি কোপাতে শুরু করে। মিন্নি সে সময় বাধা দেওয়ার ভান করলেও তদন্তকারীদের মতে তা ছিল আসামিদের আরও বেশি আঘাত করার সুযোগ করে দেওয়ার কৌশল। গুরুতর আহত অবস্থায় বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে ঐ দিন বিকেল ৩টায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় রিফাত শরীফ মারা যান।
ঘটনার পরদিন ২৭ জুন রিফাতের বাবা দুলাল শরীফ বাদী হয়ে নয়ন বন্ডকে প্রধান আসামি করে ১২ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। পরবর্তীতে ২ জুলাই পুলিশের সাথে বন্দুকযুদ্ধে মামলার প্রধান আসামি নয়ন বন্ড নিহত হয়। ১৩ জুলাই রিফাতের বাবা সংবাদ সম্মেলন করে মিন্নি এই হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত বলে দাবি জানান। গ্রেফতার হওয়া রিফাত ফরাজির জবানবন্দি ও কল রেকর্ডের তথ্য প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে মিন্নিকে প্রধান সাক্ষী থেকে আসামি করা হয়। ১ সেপ্টেম্বর পুলিশ ২৪ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করে। ২০২০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর বরগুনা জেলা ও দায়েরা জজ আদালত মিন্নিসহ ৬ জন প্রাপ্তবয়স্ক আসামিকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন এবং ৪ জনকে খালাস দেন। একই বছরের ২৭ অক্টোবর ঢাকার শিশু আদালত অপ্রাপ্তবয়স্ক ১৪ জন আসামির মধ্যে ৬ জনকে ১০ বছরের ও ৪ জনকে ৫ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করে।
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more