বিশ্বরাজনীতি (পর্ব ২১): মধ্যপ্রাচ্যের নতুন ভারসাম্য: আব্রাহাম চুক্তি, ইরান-সৌদি সম্পর্ক ও মার্কিন প্রভাবের রূপান্তর
অক্টোবর ২১, ২০২৬, ৫:২৮ এ.এম
প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: অক্টোবর ২১, ২০২৬, ৫:২৮ এ.এম
বিশ্বরাজনীতি (পর্ব ২১): মধ্যপ্রাচ্যের নতুন ভারসাম্য: আব্রাহাম চুক্তি, ইরান-সৌদি সম্পর্ক ও মার্কিন প্রভাবের রূপান্তর
অ-অ+
বিশেষ সিরিজ | বিশ্ব শাসনের ইতিহাস:
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর বৈশ্বিক রাজনীতির ইতিহাসে মধ্যপ্রাচ্য সবসময়ই ছিল সবচেয়ে অস্থিতিশীল, উত্তেজনাপূর্ণ এবং পরাশক্তিগুলোর প্রত্যক্ষ প্রভাব বিস্তারের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। খনিজ তেলের বিপুল মজুদ, গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্য পথ এবং ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্পর্শকাতরতার কারণে এই অঞ্চলকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন, মস্কো ও ইউরোপীয় পরাশক্তিগুলো বহু দশক ধরে নিজস্ব স্বার্থের ছক সাজিয়েছে। তবে একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকের শেষভাগ থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত ও কূটনৈতিক অঙ্গনে এমন কিছু পরিবর্তন সাধিত হয়েছে, যা অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক দৃশ্যপটকে পুরোপুরি নতুন এক কাঠামোর ওপর দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। দশকের পর দশক ধরে চলে আসা শত্রুতার প্রাচীর ভেঙে নতুন জোট গঠন, পরাশক্তিগুলোর ওপর নির্ভরতা হ্রাস এবং নিজেদের মধ্যকার সংঘাত কমিয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার এই প্রক্রিয়া মধ্যপ্রাচ্যে এক নতুন ভারসাম্যের জন্ম দিয়েছে।
এই কৌশলগত রূপান্তরের প্রথম বড় ধাক্কাটি আসে ২০২০ সালে অনুস্বাক্ষরিত ‘আব্রাহাম চুক্তি’ (Abraham Accords)-র মাধ্যমে। মার্কিন সহায়তায় ইসরায়েলের সাথে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, মরক্কো ও সুদান কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ঐতিহাসিক পদক্ষেপে স্বাক্ষর করে। ফিলিস্তিন সংকটের স্থায়ী সমাধান ছাড়া আরব বিশ্বের সাথে ইসরায়েলের কোনো স্বাভাবিক সম্পর্ক সম্ভব নয়—এই দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক নীতিকে পাশে সরিয়ে রেখে গঠিত এই চুক্তি অঞ্চলের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সমীকরণকে নতুন রূপ দেয়। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল মূলত মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ও সামরিক তৎপরতাকে যৌথভাবে প্রতিরোধ করা এবং একই সাথে প্রযুক্তি, বাণিজ্য, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও প্রতিরক্ষা খাতে নতুন এক অক্ষ গড়ে তোলা। আব্রাহাম চুক্তি কেবল দেশগুলোর বাণিজ্যিক দুয়ার খুলে দেয়নি, বরং এটি প্রমাণ করেছে যে মধ্যপ্রাচ্যের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এখন জাতীয় স্বার্থ ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি ভূ-রাজনৈতিক মতাদর্শের চেয়ে বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে।
তবে মধ্যপ্রাচ্যের এই নতুন ভারসাম্যের সবচেয়ে চমকপ্রদ ও বৈপ্লবিক পরিবর্তনটি ঘটে ২০২৩ সালের মার্চ মাসে, যখন চীনের মধ্যস্থতায় দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পরাশক্তি—সৌদি আরব এবং ইরান—তাদের বহু বছরের কূটনৈতিক শত্রুতার অবসান ঘটিয়ে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনে সম্মত হয়। ২০১৬ সাল থেকে ছিন্ন থাকা এই দুই দেশের সম্পর্ক জোড়া লাগার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে শিয়া-সুন্নি মেরুকরণ এবং প্রক্সি যুদ্ধের তীব্রতা অনেকটাই কমে আসে। ইয়েমেন, সিরিয়া ও লেবাননে বছরের পর বছর ধরে চলা রক্তক্ষয়ী সংঘাত প্রশমিত হওয়ার এক নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়। এই চুক্তির মাধ্যমে কেবল মধ্যপ্রাচ্যে এক ধরনের শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরে আসেনি, বরং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক নতুন বার্তা পৌঁছে যায়—মধ্যপ্রাচ্যের সংকট সমাধানে ওয়াশিংটন আর একমাত্র অনুঘটক বা অভিভাবক নয়, বরং চীন এখন অঞ্চলটির প্রধান অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে শক্তিশালী আসন গেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে এই বহুমুখী পরিবর্তনের নেপথ্যে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের ভিন্নতা। ওবামা প্রশাসনের ‘পিভট টু এশিয়া’ নীতি থেকে শুরু করে বাইডেন প্রশাসন পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে মধ্যপ্রাচ্য থেকে নিজেদের সামরিক মনোযোগ কমিয়ে ইন্দো-প্যাসিফিকের দিকে স্থানান্তরিত করার নীতি গ্রহণ করেছে। ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরীণ খনিজ তেল উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর তাদের ঐতিহ্যগত নির্ভরতা কমেছে, যা তাদের এই অঞ্চল থেকে কৌশলগত গুটিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তকে ত্বরান্বিত করেছে। এর বিপরীতে চীন তাদের বিশাল অর্থনৈতিক ক্ষমতা এবং ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (BRI)-এর আওতায় মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রগুলোর প্রধান বাণিজ্য অংশীদার ও তেল ক্রেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ওয়াশিংটনের সামরিক কেন্দ্রিক নীতির বিপরীতে বেইজিংয়ের ‘অর্থনৈতিক ও স্থিতিশীলতার কূটনীতি’ মধ্যপ্রাচ্যের নেতৃবৃন্দকে আকর্ষণ করছে।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো—বিশেষ করে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত—এখন আর কেবল কোনো একটি নির্দিষ্ট পরাশক্তির ছায়াতলে বন্দী থাকতে রাজি নয়। প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের ‘ভিশন ২০৩০’-এর মতো উচ্চাকাঙ্ক্ষী অর্থনৈতিক রূপকল্প বাস্তবায়ন করতে হলে অঞ্চলে শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক। ফলে রিয়াদ ও আবুধাবি একই সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সামরিক অংশীদারিত্ব বজায় রাখছে, চীনের সাথে কৌশলগত ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক গভীর করছে এবং ব্রিকস ও সাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেশনের (SCO) মতো জোটে যুক্ত হয়ে নিজেদের বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতির স্বাক্ষর রাখছে। মধ্যপ্রাচ্যের নতুন এই ভারসাম্য প্রমাণ করে যে, পরাশক্তিগুলোর ওপর অন্ধ নির্ভরতার দিন শেষ; অঞ্চলটি এখন নিজস্ব অর্থনৈতিক ও সামরিক স্বার্থের ওপর দাঁড়িয়ে এক নতুন বহু-মেরুভিত্তিক ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছে।
(আগামীকাল ২২শে অক্টোবর, বাইশতম পর্বে থাকছে: মহাকাশ প্রতিযোগিতা ও স্যাটেলাইট কূটনীতি: মহাকাশের নতুন সামরিকীকরণ)
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more