প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২৬, ৪:০৬ এ.এম
বাব আল-মানদেব প্রণালিতে হুতিদের আধিপত্য
অ-অ+
অনলাইন ডেস্ক:
মধ্যপ্রাচ্য ও লোহিত সাগর অঞ্চলের সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এখন বাংলাদেশের বৈশ্বিক বাণিজ্য এবং অভ্যন্তরীণ জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর এক অভূতপূর্ব সংকট তৈরি করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান কৌশলগত নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার পর সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশে জ্বালানি তেল আনার প্রধান বিকল্প পথ হয়ে উঠেছিল লোহিত সাগরের কৌশলগত বাব আল-মানদেব প্রণালি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা ইয়েমেনের মোখা বন্দর এবং প্রণালির মাঝখানে অবস্থিত অতি গুরুত্বপূর্ণ পেরিম দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ায় এই আন্তর্জাতিক রুটটিতে নিরাপত্তা ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে গেছে। যদিও হুতিদের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে কেবল সৌদি আরবের জাহাজ ছাড়া অন্য দেশের পণ্যবাহী জাহাজ নিরাপদ, তবুও প্রতিনিয়ত ছড়িয়ে পড়া নতুন যুদ্ধের আশঙ্কায় বিশ্বজুড়ে জাহাজমালিক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এই লোহিত সাগর রুটের অনিরাপদ পরিস্থিতি বাংলাদেশের পরিবহন ব্যয় ও পণ্য পৌঁছানোর সময়ে কত বড় প্রভাব ফেলছে, তার একটি স্পষ্ট উদাহরণ তৈরি করেছে বিপিসির জন্য জ্বালানি তেল বহনকারী ট্যাংকার 'এমটি নিনেমিয়া'। গত ২৩ জুলাই সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে ছেড়ে আসা জাহাজটি বাব আল-মানদেব প্রণালি হয়ে মাত্র ১৬ দিনের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাতে পারত। অথচ আক্রমণের মারাত্মক ঝুঁকি এড়াতে জাহাজটি সুয়েজ খাল, ভূমধ্যসাগর এবং পুরো আফ্রিকা মহাদেশ ঘুরে সুদীর্ঘ ৫০ দিন পর বাংলাদেশে এসে পৌঁছায়। জাহাজ পরিচালনাকারী স্থানীয় প্রতিনিধির মতে, নিরাপত্তার খাতিরে বাব আল-মানদেব এড়িয়ে এমন সুদীর্ঘ বিকল্প পথে ঘুরে আসার কারণে একটি মাত্র ট্যাংকারেই প্রায় ৪০ লাখ ডলার পর্যন্ত অতিরিক্ত ব্যয় যুক্ত হচ্ছে, যা সরাসরি অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে চাপ ফেলছে।
বাংলাদেশের জন্য এই নৌপথের গুরুত্ব কেবল জ্বালানি আমদানিতেই সীমিত নয়, বরং দেশের সার্বিক বৈদেশিক বাণিজ্যের এক বিশাল অংশ এই রুটের ওপর নির্ভরশীল। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, সৌদি আরব, মিসর ও মরক্কোসহ লোহিত সাগরনির্ভর দেশ ও অঞ্চলগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪,৬৪৫ কোটি ডলার, যা দেশের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় ৩৯ শতাংশ। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, বাংলাদেশের মোট রপ্তানি পণ্যের প্রায় ৭৭ শতাংশই লোহিত সাগর, বাব আল-মানদেব ও সুয়েজ খাল অতিক্রম করে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে যায়। পাশাপাশি দেশের মোট আমদানির প্রায় ১৫ শতাংশ পণ্যও আসে এই একই পথ ব্যবহার করে।
এই ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের তাৎক্ষণিক ধাক্কাটি আসবে জ্বালানি আমদানির খাতে। হরমুজ প্রণালি বন্ধপ্রায় হওয়ার পর যে পথটি দিয়ে দেশের প্রয়োজনীয় এলএনজি, এলপিজি, জ্বালানি তেল ও সারের সরবরাহ বজায় রাখা হয়েছিল, সেই পথ বাধাগ্রস্ত হলে দেশে জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও কৃষি উৎপাদনে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। অন্যদিকে, প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পেও বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিকল্প পথে আফ্রিকা মহাদেশের কেপ অব গুড হোপ ঘুরে ইউরোপ-আমেরিকায় পণ্য পাঠাতে হলে একদিকে যেমন ট্রানজিট সময় ১৫ থেকে ২৫ দিন বেড়ে যাবে, অন্যদিকে জাহাজভাড়া ও সামুদ্রিক বিমা মাশুল উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়ে বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রতিযোগী সক্ষমতা অনেকটাই কমিয়ে দেবে।
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more