নাব্যতা সংকটে তেঁতুলিয়া: স্তব্ধ দক্ষিণাঞ্চলের নৌপথ ও অর্থনীতি
Date: 2026-08-02
প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: আগস্ট ০২, ২০২৬, ১১:২১ এ.এম
নাব্যতা সংকটে তেঁতুলিয়া: স্তব্ধ দক্ষিণাঞ্চলের নৌপথ ও অর্থনীতি
অ-অ+
বাউফল (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি:
পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার ঐতিহ্যবাহী কালাইয়া বন্দর ও লঞ্চঘাট কেন্দ্রিক নৌ-যোগাযোগ আজ চরম অস্তিত্ব সংকটে। ঢাকা-কালাইয়া ও কালাইয়া-লালমোহনসহ দক্ষিণাঞ্চলের ব্যস্ততম নৌরুটগুলো তেঁতুলিয়া নদীর তীব্র নাব্যতা সংকটে অচল হয়ে পড়ছে। নদীর তলদেশে ডুবোচর জেগে ওঠায় থমকে গেছে নৌযান চলাচল, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে স্থানীয় অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, মৎস্য খাত এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়।
স্থানীয় ব্যবসায়ী, ট্রলার মালিক ও জেলেদের অভিযোগ, নদীর তলদেশে অসংখ্য ডুবোচর সৃষ্টি হওয়ায় ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পণ্যবাহী কার্গো ও ট্রলার নিরাপদে চলাচল করতে পারছে না। প্রায়শই ডুবোচরের সাথে ধাক্কা লেগে নৌযান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং পণ্য ডুবির ঝুঁকি বাড়ছে। ফলে পণ্য পরিবহন খরচ যেমন হু হু করে বাড়ছে, তেমনই স্থবির হয়ে পড়েছে সার্বিক বাণিজ্যিক কার্যক্রম।
নাব্যতা সংকটের কারণে নাজিরপুর থেকে লালমোহনগামী ট্রলারগুলোকে ভরা বর্ষা মৌসুমেও প্রায় ৭ থেকে ৮ কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ ঘুরে যাতায়াত করতে হচ্ছে। এতে বাড়তি সময় ও জ্বালানি খরচের পাশাপাশি চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ যাত্রীরা। ঢাকা-কালাইয়া রুটে চলাচলকারী লঞ্চ সংশ্লিষ্টরা জানান, নদীর গভীরতা কমে যাওয়ায় ঝুঁকি নিয়ে নৌযান চালাতে হচ্ছে। বিশেষ করে নারী, শিশু, বয়স্ক ও শারীরিক প্রতিবন্ধী যাত্রীদের কষ্ট এখন চরমে পৌঁছেছে।
নাব্যতা সংকটে পড়ে ইতোমধ্যে গলাচিপা, দশমিনা, কালাইয়া, নিমদী, নুরাইপুর ও কালিশুরীসহ দক্ষিণাঞ্চলের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নৌঘাটে দ্বিতল (ডাবল ডেক) লঞ্চ চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। একসময়ের জমজমাট কালাইয়া রুট থেকে বর্তমানে ঢাকায় যাতায়াত করছে মাত্র একটি দ্বিতল লঞ্চ।
উক্ত লঞ্চের প্রথম শ্রেণির মাস্টার মো. হানিফ আক্ষেপ করে বলেন: > "একসময় ঢাকা থেকে দক্ষিণাঞ্চলের এই নৌরুটে অসংখ্য স্টেশন চালু ছিল। এখন নাব্যতা সংকটের কারণে প্রায় ৯০ শতাংশ স্টেশনই বন্ধ হয়ে গেছে। এতে যাত্রীসংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ একাধিকবার নদী পরিদর্শন করে আশ্বাস দিলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি।">
স্থানীয়দের মূল অভিযোগ, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ড্রেজিং কার্যক্রম পরিচালনা করলেও যেখানে মূল সংকট, সেখানে খনন করা হচ্ছে না। নৌপথ সচল করার বদলে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আবেদনের ভিত্তিতে ঘরবাড়ি ও ভিটা ভরাটের বালু সরবরাহ করাতেই সংস্থাটি বেশি মনোযোগী। এতে সরকারের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে বলে মনে করেন নদীপাড়ের মানুষ।
তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বিআইডব্লিউটিএর হাইড্রো সলিউশনের প্রকৌশলী তানভীর মজুমদার। তাঁর মতে, সরকারি বিধিমালা মেনে আবেদন যাচাই-বাছাই করেই বালু সরবরাহ করা হয় এবং এর জন্য কোনো প্রকার আর্থিক লেনদেন হয় না।
এদিকে বাউফল উপজেলার সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প, সড়ক, সেতু ও আবাসন নির্মাণে ভিটি বালুর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে পর্যাপ্ত বালু সরবরাহ না থাকায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়নমূলক কাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
পরিস্থিতির সত্যতা স্বীকার করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সালেহ আহমেদ জানান, তেঁতুলিয়া নদীর নাব্যতা সংকটের কারণে কালাইয়া বন্দর ও যাত্রীবাহী নৌযান চলাচল ব্যাহত হওয়ার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে এবং দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী, ট্রলার মালিক, জেলে ও সচেতন নাগরিকদের দাবি—পরিবেশ ও আইনগত বিধান মেনে জরুরি ভিত্তিতে তেঁতুলিয়া নদীতে পরিকল্পিত ও বৈজ্ঞানিক ড্রেজিং শুরু করা হোক। তাঁদের বিশ্বাস, নদীর গতিপ্রবাহ ও নাব্যতা ফিরিয়ে আনা গেলে কালাইয়া বন্দর, লঞ্চঘাট ও চন্দ্রদ্বীপসহ গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলো আবার প্রাণ ফিরে পাবে। এতে নিশ্চিন্তে মাছ ধরতে পারবেন জেলেরা, আর সচল হবে সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতির চাকা।
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more