এলএনজি আমদানিতে ৩০% জামানত: কার স্বার্থে এমন কঠোর শর্ত?
Date: 2026-09-15
প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২৬, ৮:৪৬ এ.এম
এলএনজি আমদানিতে ৩০% জামানত: কার স্বার্থে এমন কঠোর শর্ত?
অ-অ+
স্টাফ রিপোর্টার:
দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানিতে পেট্রোবাংলার ৩০ শতাংশ ব্যাংক গ্যারান্টি বা জামানতের শর্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও বিদেশি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের একাংশের অভিযোগ, এত উচ্চ জামানতের শর্তে অনেক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে এলএনজি সরবরাহে নিরুৎসাহিত হতে পারে। এতে প্রতিযোগিতা কমে গিয়ে নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানের সুবিধা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।
তবে ৩০ শতাংশ জামানতের শর্তের বিষয়ে পেট্রোবাংলার আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা এবং সংশ্লিষ্ট চুক্তির নথি পর্যালোচনা করা জরুরি। একইভাবে উচ্চমূল্যে এলএনজি কেনার অভিযোগও যাচাই করতে হবে একই সময়ের বাজারদর, পরিবহন ব্যয়, সরবরাহের সময়, পেমেন্ট শর্ত ও চুক্তির অন্যান্য বিষয় বিবেচনায় নিয়ে।
৩০ শতাংশ জামানত নিয়ে প্রশ্ন খাতসংশ্লিষ্টদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ১ লাখ মেট্রিক টন এলএনজির একটি কার্গোতে প্রতি এমএমবিটিইউ ১৫ ডলার দর ধরা হলে মোট মূল্য প্রায় ৭ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৯৫৯ কোটি ৪০ লাখ টাকা।
এই মূল্যের ৩০ শতাংশ ব্যাংক গ্যারান্টি দিতে হলে প্রায় ২৮৬ কোটি ৮২ লাখ টাকার সমপরিমাণ জামানত প্রয়োজন হতে পারে।
একজন বিদেশি এলএনজি ব্যবসায়ী বলেন, “একটি কার্গোর বিপরীতে এত বড় অঙ্কের ব্যাংক গ্যারান্টি অনেক সরবরাহকারীর জন্য বড় আর্থিক চাপ। এতে প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।”
আরেক ব্যবসায়ীর ভাষ্য, “সরকার যদি প্রতিযোগিতামূলক দরে এলএনজি কিনতে চায়, তাহলে সরবরাহকারীদের অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানো দরকার। কোনো শর্ত যদি প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিরুৎসাহিত করে, সেটি কেন রাখা হয়েছে তা পরিষ্কার করা উচিত।”
তবে বাজারদরও এখন অস্থির এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আন্তর্জাতিক এলএনজি বাজার বর্তমানে যথেষ্ট অস্থির। ফলে আগের কোনো সময়ের ১৫ ডলারের বাজারদর দিয়ে ২০২৬ সালের প্রতিটি কার্গোর মূল্য সরাসরি তুলনা করা যাবে না।
আগস্ট ২০২৬-এর একটি দরপ্রক্রিয়ায় ২৬-২৭ আগস্টের কার্গো সরবরাহে ২৫ দশমিক ৩১ ডলার দর দিয়ে একটি প্রতিষ্ঠান সর্বনিম্ন দরদাতা হয়েছিল বলে প্রথম আলো জানিয়েছে।
অর্থাৎ, ২৫ ডলারের আশপাশের দর যে সাম্প্রতিক সময়ে বাস্তবে এসেছে, তার সংবাদভিত্তিক নজির রয়েছে। তাই কোনো কার্গো ২৮-২৯ ডলারে কেনা হলে একই সময়ের তুলনীয় বাজারদর ও চুক্তির শর্ত প্রকাশ করা হলে বোঝা যাবে অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ হয়েছে কি না।
১৫.৪০ বা ১৫.৯০ ডলারের প্রস্তাবের দাবি কতটা সত্য? এলএনজি খাতের কয়েকজন ব্যবসায়ী দাবি করছেন, বিভিন্ন সময়ে প্রতি এমএমবিটিইউ ১৫.৪০, ১৫.৯০ ও ২০.৫০ ডলারের মতো প্রস্তাব পাওয়া গেলেও সেগুলো যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি।
তবে এ দাবির সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট দরপত্র ও মূল্যায়ন নথি প্রয়োজন। কারণ এলএনজি ক্রয়ের ক্ষেত্রে শুধু ইউনিট মূল্য নয়, সরবরাহের সময়, ডেলিভারি পয়েন্ট, জাহাজ ভাড়া, পেমেন্টের শর্ত, চুক্তির মেয়াদ এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক বিষয়ও মূল্য নির্ধারণে প্রভাব ফেলে।
একজন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বলেন, “একই সময়ে একই ধরনের শর্তে একটি প্রতিষ্ঠান যদি উল্লেখযোগ্যভাবে কম দরে এলএনজি সরবরাহের প্রস্তাব দেয়, তাহলে বেশি দরের প্রস্তাব কেন গ্রহণ করা হলো, তার লিখিত ব্যাখ্যা থাকা উচিত।”
সরবরাহকারী বাড়াচ্ছে পেট্রোবাংলা অন্যদিকে, পেট্রোবাংলার সাম্প্রতিক কার্যক্রমে নতুন সরবরাহকারী যুক্ত করার উদ্যোগও দেখা যাচ্ছে। সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি সরবরাহের জন্য নতুন সরবরাহকারী তালিকাভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।
এতে বোঝা যায়, সরবরাহকারী সংখ্যা বাড়ানোর একটি প্রক্রিয়া কর্তৃপক্ষের রয়েছে। ফলে ৩০ শতাংশ জামানতের শর্ত বাস্তবে কতটা প্রতিষ্ঠানকে নিরুৎসাহিত করছে, সেটি জানতে আবেদনকারী, তালিকাভুক্ত এবং কার্যত সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের তথ্য বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
বিশ্বব্যাংকের গ্যারান্টি নিয়েও বড় উদ্যোগ এলএনজি আমদানির অর্থ পরিশোধের চাপ কমাতে বাংলাদেশ বিশ্বব্যাংকের গ্যারান্টি সুবিধা নিচ্ছে। ২০২৫ সালে এলএনজি আমদানির জন্য ৩৫০ মিলিয়ন ডলারের গ্যারান্টি সুবিধার উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং ২০২৬ সাল থেকে এর সুবিধা পাওয়ার কথা জানানো হয়েছিল।
২০২৬ সালের আগস্টে আরও ৩৫০ মিলিয়ন ডলারের গ্যারান্টি নিয়ে অগ্রগতির খবরও প্রকাশিত হয়েছে।
এ অবস্থায় এলএনজি আমদানিতে একদিকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বড় অঙ্কের আর্থিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে সরবরাহকারীদের ওপর ৩০ শতাংশ জামানতের শর্ত কতটা প্রয়োজনীয়, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। ‘সিন্ডিকেট’ অভিযোগের তদন্ত চায় ব্যবসায়ীরা
এলএনজি খাতের কয়েকজন ব্যবসায়ীর অভিযোগ, কঠোর জামানতের শর্তের কারণে নতুন সরবরাহকারীরা পিছিয়ে গেলে বাজারে প্রতিষ্ঠিত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের প্রভাব বাড়তে পারে। তারা এটিকে ‘সিন্ডিকেট’ তৈরির সম্ভাব্য ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন।
এক ব্যবসায়ী বলেন, “কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে অভিযুক্ত করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। কিন্তু একই ধরনের প্রতিষ্ঠান যদি বারবার সুবিধা পায় এবং অন্যরা শর্তের কারণে প্রতিযোগিতায় আসতে না পারে, তাহলে বিষয়টি স্বাধীনভাবে তদন্ত করা দরকার।”
আরেক ব্যবসায়ীর বক্তব্য, “কে কত দরে প্রস্তাব দিয়েছে, কে কেন বাদ পড়েছে, কে নির্বাচিত হয়েছে এবং চূড়ান্ত চুক্তিতে কী দাম নির্ধারণ করা হয়েছে, এসব তথ্য প্রকাশ করলেই অনেক অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা সম্ভব।”
পেট্রোবাংলার কাছে ৮ প্রশ্ন 1. এলএনজি আমদানিতে ৩০ শতাংশ ব্যাংক গ্যারান্টির শর্ত কেন নির্ধারণ করা হয়েছে?
2. এই হার নির্ধারণে কোন আন্তর্জাতিক বা বাণিজ্যিক মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়েছে?
3. এই শর্তের কারণে কোনো বিদেশি সরবরাহকারী বাংলাদেশে সরবরাহে অনাগ্রহ দেখিয়েছে কি না?
4. একই সময়ে একাধিক কম দরের প্রস্তাব থাকলে সেগুলো কেন গ্রহণ করা হয়নি?
5. ২৫ থেকে ২৯ ডলারের দরের কার্গো কেনার ক্ষেত্রে মূল্যায়নের ভিত্তি কী ছিল?
6. প্রতিটি কার্গোর ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারদর ও বাংলাদেশের ক্রয়মূল্যের তুলনামূলক হিসাব করা হয় কি?
7. সরবরাহকারী বাছাইয়ের মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে কি?
8. কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষে বাজারে একচেটিয়া সুবিধা তৈরির অভিযোগ পেট্রোবাংলা তদন্ত করবে কি?
তদন্ত হলেই বেরিয়ে আসবে প্রকৃত চিত্র এলএনজি আমদানিতে অনিয়ম, অতিরিক্ত মূল্য বা কোনো বিশেষ গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ সত্য কি না, তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। তবে রাষ্ট্রীয় অর্থের বড় অঙ্কের ব্যয়ের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় বিষয়টি নথিভিত্তিকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে ৩০ শতাংশ জামানতের শর্ত, সরবরাহকারীদের অংশগ্রহণের হার, প্রতিটি দরপ্রস্তাব, মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ, চূড়ান্ত অনুমোদন এবং চুক্তিমূল্য পাশাপাশি বিশ্লেষণ করলে অভিযোগের বাস্তবতা স্পষ্ট হতে পারে।
একজন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বলেন, “এখানে কাউকে আগে থেকেই দোষী সাব্যস্ত করার প্রয়োজন নেই। দরপত্র ও চুক্তির নথি স্বাধীনভাবে পরীক্ষা করলেই বোঝা যাবে কোথাও অস্বাভাবিকতা আছে কি না।”
এলএনজি দেশের বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি। তাই আমদানির প্রতিটি পর্যায়ে স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতা এবং রাষ্ট্রীয় অর্থের সর্বোচ্চ সাশ্রয় নিশ্চিত করা জরুরি।
খাতসংশ্লিষ্টদের দাবি, ৩০ শতাংশ জামানতের শর্ত যৌক্তিক হলে তার কারণ প্রকাশ করা হোক। আর যদি এই শর্তের কারণে প্রতিযোগিতা কমে গিয়ে রাষ্ট্রীয় অর্থের ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হয়, তাহলে তা পুনর্বিবেচনা করা হোক। একই সঙ্গে উচ্চমূল্যে এলএনজি আমদানি বা কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ থাকলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বের করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
এখন প্রশ্ন একটাই: এলএনজি আমদানিতে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ স্বার্থ নিশ্চিত হচ্ছে, নাকি কোনো পর্যায়ে তৈরি হচ্ছে অপ্রয়োজনীয় আর্থিক চাপ?
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more