প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: আগস্ট ২৯, ২০২৬, ১১:৩৪ এ.এম
হিটলারের শেষ পরিণতির অজানা অধ্যায়
অ-অ+
হিটলারের রহস্যজনক মৃত্যু:
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষলগ্নে বার্লিন শহরের নিয়ন্ত্রণ যখন সোভিয়েত বাহিনীর হাতে চলে যায়, তখন নাৎসি জার্মানির একচ্ছত্র শাসক এডলফ হিটলার মাটির গভীরে তৈরি একটি সুসংরক্ষিত বাংকারে আশ্রয় নেন। প্রতিষ্ঠিত ইতিহাস অনুযায়ী, ১৯৪৫ সালের ৩০ এপ্রিল তিনি নিজ বাংকারেই আত্মহত্যা করেন। তবে যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে তার মরদেহ প্রকাশ্যে না আনা এবং সোভিয়েত শাসকগোষ্ঠীর অস্পষ্ট বিবৃতির ফলে এই মৃত্যু নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দেয়। পরবর্তীতে শীর্ষ নাৎসি অপরাধীরা সাবমেরিনে চড়ে দক্ষিণ আমেরিকায় পালিয়ে যাওয়ার পর এই সংশয় আরও ঘনীভূত হয়— হিটলার কি আসলেই বার্লিনে মারা গিয়েছিলেন, নাকি আত্মহত্যার নাটক সাজিয়ে আড়ালে চলে গিয়েছিলেন?
হিটলারের শেষ মুহূর্তগুলোর প্রত্যক্ষদর্শী এবং নাৎসি কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নিশ্চিত করে যে, ৩০ এপ্রিল হিটলার এবং তার স্ত্রী ইভা ব্রাউন বাংকারের একটি কক্ষে মারা যান। হিটলার নিজের মাথায় গুলি চালান এবং ইভা ব্রাউন বিষপান করেন। পরবর্তীতে তাদের মরদেহ চ্যান্সেলরি ভবনের পেছনের বাগানে নিয়ে পেট্রোল ঢেলে পুড়িয়ে ফেলা হয়। তবে কেবল অনুগত সহযোগীদের জবানবন্দির ওপর নির্ভর না করে বিজ্ঞানীরা ফরেনসিক প্রমাণের দিকে জোর দেন। হিটলারের দাঁতের গঠন ছিল বেশ অনন্য। উদ্ধার করা পোড়া চোয়াল ও কৃত্রিম দাঁতের অবশিষ্টাংশ পরীক্ষা করে হিটলারের নিজস্ব ডেন্টিস্টের প্রতিনিধিরা সেটির সত্যতা নিশ্চিত করেন। পরবর্তীতে ২০১৮ সালে ফরাসি গবেষক ফিলিপ চার্লিয়ার রাশিয়ার আর্কাইভে সংরক্ষিত দাঁতের অবশিষ্টাংশ পরীক্ষা করে ১৯৪৪ সালে নেওয়া হিটলারের এক্স-রের সঙ্গে নিখুঁত মিল খুঁজে পান। ‘ইউরোপিয়ান জার্নাল অব ইন্টারনাল মেডিসিন’-এ প্রকাশিত এই গবেষণা থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়, ১৯৪৫ সালের ৩০ এপ্রিলেই হিটলারের জীবনাবসান ঘটেছিল।
মৃত্যুর পূর্বে ইতালির স্বৈরশাসক বেনিতো মুসোলিনির বিকৃত মরদেহ প্রকাশ্যে ঝুলিয়ে রাখার দৃশ্য দেখে আতঙ্কিত হিটলার নির্দেশ দিয়েছিলেন, তার মরদেহ যেন সম্পূর্ণ ধ্বংস করা হয়। বার্লিনের 'ফিউরারবাংকার' এলাকাটি প্রথম দখল করে সোভিয়েত সেনারা। তবে তারা মিত্রশক্তি বা সংবাদমাধ্যমের সামনে মরদেহ উপস্থাপন না করে ১৯৪৫ সালের জুন মাসে হঠাৎ দাবি করে— হিটলার হয়তো পালিয়ে গেছেন। ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআই-ফাইভের (MI5) নথি থেকে দেখা যায়, সোভিয়েতদের এই রহস্যজনক নীতি ও গোপনীয়তার পরপরই বিশ্বজুড়ে হিটলারকে বেঁচে থাকতে দেখার অজস্র গুজব ছড়িয়ে পড়ে। এই বিভ্রান্তিকর বক্তব্যই মূলত পরবর্তী ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলোর জন্ম দেয়।
হিটলারের পালিয়ে যাওয়ার তত্ত্বে বার্লিনের ভূগর্ভস্থ জটিল অবকাঠামোর বড় ভূমিকা রয়েছে। চ্যান্সেলরি ভবনের প্রায় ২৪ ফুট নিচে অবস্থিত ‘ফিউরারবাংকার’ কেবল বিমান হামলা থেকেই নাৎসি নেতাদের রক্ষা করত না, বরং শহরের অন্যান্য ভূগর্ভস্থ মেট্রো (ইউ-বান), রেল সুড়ঙ্গ ও এয়ার রেইড শেল্টারের সাথে যুক্ত ছিল। গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, বাংকার থেকে বিমানবন্দর কিংবা সমুদ্র উপকূলে যাওয়ার ভূগর্ভস্থ পথ ছিল। ধারণা করা হয়, এসব পথ ব্যবহার করে সাবমেরিন ডকিং স্টেশন পর্যন্ত পৌঁছানো এবং আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দেওয়া অসম্ভব ছিল না।
যুদ্ধের পর 'ইউ-৫৩০' এবং 'ইউ-৯৭৭' নামের দুটি জার্মান সাবমেরিন আর্জেন্টিনার উপকূলে গিয়ে আত্মসমর্পণ করে। সাবমেরিনগুলোর লগবুক ফেলে দেওয়ায় সন্দেহ জাগে যে, এগুলোতে করে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই (FBI) দীর্ঘকাল ধরে এই সম্ভাবনা নিয়ে গোপন তদন্ত চালিয়েছিল। ইতিহাসের সত্য হলো, বহু শীর্ষ নাৎসি কর্মকর্তা সত্যিই দক্ষিণ আমেরিকায় আত্মগোপন করেছিলেন। ইহুদি নিধনযজ্ঞের প্রধান কারিগর এডলফ আইখম্যানকে ১৯৬০ সালে আর্জেন্টিনা থেকেই গ্রেফতার করে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ। এমনকি নাৎসি চিকিৎসক জোসেফ মেঙ্গেলেও সেখানে নিজস্ব নাগরিকত্ব পেয়েছিলেন। পরবর্তীতে আর্জেন্টিনার গহীন জঙ্গলে ১৯৪০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে নির্মিত কিছু ভবনের ধ্বংসাবশেষ ও নাৎসি জমানার মুদ্রা পাওয়া যায়। অনেক গবেষকের মতে, এগুলো পরাজয়-পরবর্তী সময়ে নাৎসিদের 'সেফ হাউস' হিসেবে আগে থেকেই প্রস্তুত রাখা হয়েছিল।
সব বৈজ্ঞানিক তথ্যপ্রমাণ অনুযায়ী বার্লিনের বাংকারেই হিটলারের মৃত্যু হয়েছিল। তবে মরদেহের অনুপস্থিতি এবং দক্ষিণ আমেরিকায় নাৎসিদের আশ্রয়ের বাস্তবিক তথ্যগুলোর কারণেই হিটলারের পরিণতি নিয়ে আজও রহস্য বজায় রয়েছে।
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more