প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: জুলাই ১২, ২০২৬, ৭:৪২ এ.এম
কোকা-কোলার যে কালো সত্য কখনো বলেনি কেউ!
অ-অ+
বিশেষ প্রতিবেদন | বিডিফেস ২৪:
জীবনে অন্তত একবার কোকা-কোলার বোতলে চুমুক দেননি কিংবা নিদেনপক্ষে কোকের নাম শোনেননি, এমন লোকের জুড়ি মেলা ভার। স্বচ্ছ কাঁচ বা প্লাস্টিকের বোতলে পূর্ণ লাল রঙের এই কোমল পানীয়ের জনপ্রিয়তা আকাশছোঁয়া। ক্লান্ত, অবসন্ন শরীরকে একটু চাঙ্গা করতে বা বড়সড় এক ভূরিভোজের পর কয়েক ঢোক কোকা-কোলার চেয়ে ভালো সঙ্গ আর কেই বা দিতে পারে! বিশ্বের যে প্রান্তেই আপনি যান না কেন, রকমারি দোকানগুলোর ফ্রিজারের তাকগুলোতে এর দেখা যে আপনি পাবেন, তা চোখ বুজেই বলে দেওয়া যায়। এমনকি পৃথিবীর বাইরে মহাকাশেও নিজের অস্তিত্ব জানান দিয়েছে কোকা-কোলা। মর্তে তৈরি লোহিত বর্ণের এই স্বর্গীয় অমৃত সুধার পেছনের গল্পটা জানেন কি?
চলুন, বিডিফেস ২৪-এর এই বিশেষ প্রতিবেদনের মাধ্যমে আমরা আজ জেনে নেই কোকা-কোলার পেছনের সেই অজানা ও রোমাঞ্চকর ইতিহাস। কোকা-কোলার আবিষ্কার এক 'পার মাতাল'-এর হাত ধরে। কি? চমকে উঠলেন? এতেই যদি চমকে যান, তাহলে চমকের আরও অনেক কিছুই এখনো বাকি আপনার জন্য।
একটি মাতালের হাতে প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি কীভাবে আজকের মাল্টি-বিলিয়নিয়ার কোম্পানিতে পরিণত হলো, তা এক অপার বিস্ময়ের গল্প। ১৮৬৫ সালের এপ্রিল মাসের কোনো এক মলিন সন্ধ্যা। আমেরিকা জুড়ে তখন ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ চলছে। জর্জিয়ার কলম্বাসে যুদ্ধের ময়দানে গুরুতর আহত হলেন এক কর্নেল, নাম জন পেম্বারটন। তিনি একজন ফার্মাসিস্টও ছিলেন। মারাত্মকভাবে জখম হবার পর ডাক্তার তাকে উচ্চ ডোজের মরফিন দিলেন, যেন জীবন সায়াহ্নের সন্ধিক্ষণের সময়টা একটু শান্তিতে থাকতে পারেন। কিন্তু স্রষ্টার ডায়েরিতে যে অন্য কিছু লেখা ছিল! অলৌকিকভাবে বেঁচে যান তিনি। তবে যে মরফিন তাকে ব্যথানাশক হিসেবে দেওয়া হয়েছিল, সে মরফিনে আসক্ত হয়ে পড়েন পেম্বারটন।
যখন দেখলেন নেশা আর ছাড়তেই পারছেন না, তখন প্রায় এক দশক ধরে মরফিনের বিকল্প কিছু উদ্ভাবনের চেষ্টা করতে লাগলেন এই ফার্মাসিস্ট। একসময় সফলও হলেন তিনি। ১৮৮৫ সালে নিয়ে আসেন এক টনিক, যার নাম ‘পেম্বারটন'স ফ্রেঞ্চ ওয়াইন কোলা’। এটি তৈরি হতো কোকা লিভস আর কোলা নাটস-এর সমন্বয়ে। শুরুতে সিরাপের শিশিতে করে এই টনিক বিক্রি হতো ফার্মেসিতে। বলা হতো, এটি বদহজম, স্নায়ুবিক দুর্বলতা, মাথাব্যথা, মরফিন আসক্তি—এমনকি পুরুষত্বহীনতার মতো সমস্যারও নিরাময়ক। অন্তত পেম্বারটন এমনটাই দাবি করতেন।
তবে কিছুদিনের মধ্যেই বাধলো বিপত্তি। ১৮৮৬ সালে জর্জিয়ায় নিষিদ্ধ হলো অ্যালকোহল। এখন উপায়? উপায় অবশ্য একটা বের করেই ফেললেন আমাদের মাতাল ফার্মাসিস্ট। তার আবিষ্কৃত আগের ফর্মুলা থেকে অ্যালকোহল সরিয়ে ফেললেন। সাথে যোগ করলেন কার্বোনেটেড ওয়াটার আর এক গাদা চিনি—তা ধরুন প্রায় প্রতি গ্যালন সিরাপে পাঁচ পাউন্ডেরও বেশি। কিন্তু পেম্বারটনের ভাগ্য খুব একটা সুপ্রসন্ন ছিল না। এই নতুন রেসিপি খুব একটা চললো না বাজারে। প্রথম বছরে মাত্র ৬০০ গ্যালন সিরাপ বিক্রি হলো। এই দারুণ কষ্ট এবং শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে বাধ্য হয়ে মাত্র ২৩০০ ডলারে পেম্বারটন কোকা-কোলার স্বত্ব বিক্রি করে দিলেন আরেক ফার্মাসিস্ট আশা ক্যান্ডেলার-এর কাছে। তার কিছুদিন পরেই মারা যান পেম্বারটন। নিজের আবিষ্কৃত পানীয়ের জনপ্রিয়তার ছিটেফোঁটাও দেখে যাওয়ার মতো চাঁদ কপাল হয়নি তার। তবে ক্যান্ডেলার ছিলেন ছানু লোক। তিনি বুঝতে পারলেন, ঘাপলাটা রেসিপিতে নয়, অভাব ছিল প্রচারের ও প্রসারের। সেদিকেই মন দিলেন তিনি। আটলান্টা ছেয়ে ফেললেন কোকা-কোলার লোগো দিয়ে। বাড়ির দেওয়াল থেকে মানিব্যাগ, খবরের কাগজ থেকে ক্যালেন্ডার—বাদ যাবে না কোনো কিছুই। তবে তাতেও ভাগ্যদেবতা খুব একটা মুক্তহস্তে চাইলেন না। হাল ছাড়ার পাত্র নন ক্যান্ডেলার। এবার আশেপাশের প্রতিটা বড় ফার্মেসির সাথে যোগাযোগ করে তাদের বড় বড় খদ্দেরদের লিস্ট জোগাড় করলেন। এরপর প্রতিটা খদ্দেরকে এক গ্লাস ফ্রি কোকের একটা করে কুপন পাঠালেন। ফ্রিতে পেলে কে না একবার চেখে দেখে বলুন? আর যদি চেখে দেখার পর ভালো লেগেই যায়, তাহলে তো কেল্লাফতে! হ্যাঁ, যেমনটা ভাবছেন তেমনটাই ঘটেছিল। ১০ বছরেরও কম সময়ের ব্যবধানে কোকা-কোলার বাৎসরিক বিক্রি গিয়ে দাঁড়ায় আড়াই লক্ষ গ্যালনে। তারপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ৬০০ গ্যালন থেকে আড়াই লক্ষ গ্যালন—তফাতটা ধরতে পারছেন?
এরই মাঝে কোকের রেসিপিতে কিন্তু পরিবর্তন এসেছে একাধিকবার। যে কোকা লিভস দিয়ে এটি তৈরি হতো, তাতে রয়েছে বড়সড় মাত্রার কোকেনের উপস্থিতি। হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন—ভয়ংকর মাদকদ্রব্য কোকেনের কথাই বলছি। একটা সময় ছিল যখন প্রতি গ্লাস কোকে ৯ মিলিগ্রাম কোকেন থাকতো। পরবর্তীতে আমেরিকায় কোকেন ডিস্ট্রিবিউশন নিষিদ্ধ হওয়ায় ‘ডিকোকেনাইজড’ কোকা লিভস-এর ব্যবহার শুরু হয় এবং সে প্রক্রিয়া এখনো চলমান। যদিও ব্যবহৃত কোকা লিভস শতভাগ কোকেনমুক্ত কি না, তা নিয়ে ঢের মতবিরোধ রয়েছে। এর সাথে সেই কার্বোনেটেড ওয়াটার, ক্যাফেইন, ফসফরিক অ্যাসিড, কালার আর বাকিটা—পুরোটাই চিনি। সেই চিনি, যেটাকে চিকিৎসাবিদেরা ডাকেন 'হোয়াইট পয়জন' নামে। ৩৩০ মিলিলিটারের এক ক্যান কোকা-কোলা পান করলে ১০ চা চামচ পরিমাণ চিনি সরাসরি আপনার শরীরে প্রবেশ করে, যা প্রতিদিন গ্রহণযোগ্য চিনির পরিমাণের মাত্রার প্রায় আড়াই গুণ। এতটা চিনি একবারে খেলে যে কারও বমি হয়ে যেতে পারে।
তবে এখানেই খেল দেখায় ফসফরিক অ্যাসিড। কোকের মিষ্টতা কমিয়ে ফেলে এটি। ফলে আরামসে ঢকঢক করে গিলে ফেলা যায় পুরোটা। আর যে ক্যাফেইনের কথা বললাম, শুরুর দিকে তার উৎস ছিল কোলা নাটস। কোকের আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা আর চাহিদার কারণে এখন আর কোলা নাটস, চাপাতা বা কফির বিনের মতো প্রাকৃতিক উৎসে পোষায় না। এখন ভরসা আলকাতরা। হ্যাঁ বন্ধু, আপনার হাতের কোকের বোতলটিতে যার জন্য এত মাদকতা, তার জন্ম আলকাতরা থেকে।
কোক যে শরীরের জন্য খুব একটা ভালো কিছু না, সেটা আমরা কম-বেশি সবাই জানি। উচ্চমাত্রায় চিনিযুক্ত কোক পানে রক্তে শর্করার পরিমাণ বেড়ে যায়, বাড়ে রক্তচাপ। এ ধরনের চিনিযুক্ত পানীয় নিয়মিত গ্রহণে ডায়াবেটিস, হৃদরোগসহ নানা ধরনের জটিল রোগের ঝুঁকি রয়েছে। এ পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি কোক খায় মেক্সিকোর চিয়াপাস স্টেটের লোকেরা। সেখানে ডায়াবেটিসের কারণে মৃত্যু মোটামুটি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। কোকা-কোলা কোম্পানি কিন্তু এসব স্বীকার করতে একেবারেই নারাজ। নারাজ হবারই কথা, তাই না? তাদের তো দরকার মুনাফা। আর এই মুনাফার জন্য যুগে যুগে কম ছলচাতুরী বা অপকৌশলের আশ্রয় কিন্তু তারা নেয়নি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথাই ধরুন না। সারা বিশ্বের জন্য যে যুদ্ধ এসেছিল অভিশাপ হয়ে, সেটাকে নিজেদের প্রসারের হাতিয়ার হিসেবে কাজে লাগায় কোকা-কোলা কর্তৃপক্ষ। প্রতি বোতল কোক মাত্র ৫ সেন্টের বিনিময়ে যুদ্ধরত আমেরিকান সেনাদের কাছে বিক্রি করে তারা। উদ্দেশ্য—সবার চোখে দেশপ্রেমিক সাজা। পরবর্তীতে এই আমেরিকান সেনাদের হাত ধরেই কোক সারা বিশ্বে বিপুল জনপ্রিয়তা পায়। তার মাত্রা এতটাই ছিল যে, একপর্যায়ে নাৎসি জার্মানি পর্যন্ত কোক কিনতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। কিন্তু তাদের কাছে বেচলে তো সমস্যা। দেশবাসীকে স্বদেশপ্রেমের যে খোল খাইয়েছেন এতদিন, তা তো আর ধোপে টিকবে না। শেষমেশ কোকা-কোলা কোম্পানি জার্মানির জন্য নিয়ে আসে তাদের নতুন পানীয় 'ফান্টা'। এতে যুদ্ধরত দুই পক্ষের কাছেই ব্যবসা করা গেল, কোম্পানির প্রচারও হয়ে গেল, আর দেশবাসীর সামনে গুড ইমেজও ধরে রাখা গেল। এক ঢিলে তিন পাখি!
কোকা লিভস-এর ব্যাপারটাতে আসা যাক। কোকেন ডিস্ট্রিবিউশন নিষিদ্ধ হবার পর গোটা আমেরিকায় কোকা লিভস অবাধে আমদানির লাইসেন্স রয়েছে একমাত্র স্টিফান কোম্পানির, যারা কোকা লিভস থেকে কোকেন নিষ্কাশনের পর অবশিষ্টাংশ সাপ্লাই দেয় কোকা-কোলা কোম্পানিতে। এ থেকেই তৈরি হয় কোক। অন্য কোনো কোম্পানি এই সুবিধা পায় না বলে বাজারে কোকা ফ্লেভার্ড ড্রিংকস আর নেই। ফলে এই সেক্টরে এক প্রকার মনোপলি বজায় রেখেছে কোকা-কোলা। আর এই সুবিধা কোকা-কোলা কোম্পানি আদায় করেছে ইউএস গভর্মেন্টকে হাত করে। কোকা-কোলাকে সুবিধা দেওয়ার জন্য বিশেষভাবে প্রণীত এই আইনকে অনেকেই ব্যঙ্গ করে ডাকেন 'কোকা-কোলা জোক অ্যাক্ট' নামে। এছাড়া অতীতে কোকেন বিক্রির সাথেও সরাসরি জড়িত ছিল কোকা-কোলা কোম্পানি। বাচ্চাদের স্কুলে ডোনেশন দিয়ে টিফিনে দুধ বা ফলের জুসের বদলে নিজেদের অস্বাস্থ্যকর প্রোডাক্ট দিতে বাধ্য করার মতো ঘৃণ্য অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
বলা হয়ে থাকে, এখন পর্যন্ত যত কোকা-কোলা উৎপাদন করা হয়েছে, সেগুলো যদি সাড়ে সাত ইঞ্চি দৈর্ঘ্যের বোতলে রেখে একটির পর আরেকটি জোড়া লাগানো হয়, তাহলে যে দৈর্ঘ্যটা হবে, সেটা পৃথিবী থেকে চাঁদে ১৬৭৭ বার যাওয়া-আসার দূরত্বের সমান। ব্র্যান্ড ভ্যালুর দিক দিয়ে কোকা-কোলা বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম কোম্পানি। আর হবে নাই বা কেন? প্রতিদিন বিশ্বে গড়ে ১.৯ বিলিয়ন বোতল কোক বিক্রি হয়। অংকটা নেহাতি কম নয় বৈকি! শুধুমাত্র কিউবা আর উত্তর কোরিয়া ছাড়া এ পৃথিবীতে এমন কোনো দেশ নেই যেখানে আপনি কোক পাবেন না। এমনকি মাউন্ট এভারেস্টের বেস ক্যাম্পেও পাবেন কোকের দেখা। যেন তামাম পৃথিবীটাই বুঁদ হয়ে আছে কোকের নেশায়।
তবে পকেটের টাকা খরচ করে আলকাতরাজাত ক্যাফেইন আর চিনি গোলানো পানি গলায় ঢেলে নিজের স্বাস্থ্যের বারোটা বাজিয়ে সেই নেশার আড্ডায় আপনিও শামিল হবেন কি না, সে সিদ্ধান্ত একান্তই আপনার।
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more