বিশ্বরাজনীতি (পর্ব ৫): স্নায়ুযুদ্ধ ও দ্বিমেরু বিশ্ব: ওয়াশিংটন বনাম মস্কো
Date: 2026-10-05
প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: অক্টোবর ০৫, ২০২৬, ৪:৪৭ এ.এম
বিশ্বরাজনীতি (পর্ব ৫): স্নায়ুযুদ্ধ ও দ্বিমেরু বিশ্ব: ওয়াশিংটন বনাম মস্কো
অ-অ+
বিশেষ সিরিজ | বিশ্ব শাসনের ইতিহাস:
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অগ্নিকুণ্ড থেকে বের হয়ে আসা ধ্বংসস্তূপের ধোঁয়া তখনো ইউরোপের আকাশ থেকে পুরোপুরি মেলেনি। বিজয়ের উল্লাস থামতে না থামতেই বিশ্বজুড়ে নেমে এলো এক অজানা, স্তব্ধ ও থমথমে নীরবতা। হাজার বছরের পুরোনো ইউরোপীয় পরাশক্তিগুলোর অস্তিত্ব ততদিনে চুরমার হয়ে গেছে। বিশ্ব শাসনের ব্যাটন এখন এমন দুটি মেগা-পরাশক্তির হাতে, যাদের আদর্শ, অর্থনীতি এবং জীবনদর্শন এক বিন্দুতে মেলানো ছিল অসম্ভব। একপক্ষে পুঁজিবাদ, মুক্তবাজার অর্থনীতি ও তথাকথিত পশ্চিমা গণতন্ত্রের পতাকাবাহী ওয়াশিংটন; অন্যদিকে সাম্যবাদ, রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি ও সোশ্যালিস্ট বিপ্লবের লাল পতাকাবাহী মস্কো। ১৯৪৫ থেকে ১৯৯১—দীর্ঘ সাড়ে চার দশক ধরে চলা এই স্নায়ুযুদ্ধ বা ‘কোল্ড ওয়ার’ কোনো সাধারণ সামরিক মহড়া ছিল না, এটি ছিল পুরো বিশ্বকে দুটি মনস্তাত্ত্বিক ব্লকে জিম্মি করে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার এক অভূতপূর্ব বৈশ্বিক খেলা।
এই সংঘাতের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক ছিল এর নামকরণ। রক্তক্ষয়ী দুই বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতার পর তৎকালীন সামরিক বিজ্ঞানীরা বুঝতে পেরেছিলেন যে, দুই পরাশক্তির হাতেই জমে উঠেছে হাজার হাজার পারমাণবিক অস্ত্রের পাহাড়। সরাসরি যুদ্ধে নামার অর্থ ছিল ‘মিউচুয়ালি অ্যাসিওরড ডেস্ট্রাকশন’ (MAD)—অর্থাৎ, একে অপরকে ধ্বংস করতে গিয়ে পুরো পৃথিবীর জীবজগৎকে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বিলুপ্ত করে দেওয়া। এই নিশ্চিত ধ্বংসের ভয়ই ওয়াশিংটন ও মস্কোকে সরাসরি রণাঙ্গনে মুখোমুখি হওয়া থেকে বিরত রেখেছিল। বন্দুকের গর্জন না থাকলেও শুরু হলো এক মানসিক ও স্নায়ুর লড়াই। কূটনৈতিক কৌশল, প্রোপাগান্ডা, গোপন তথ্য চুরি এবং সিআইএ ও কেজিবির মতো বিশ্বসেরা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যবর্তী এই অদৃশ্য স্নায়ুর যুদ্ধ মানবজাতিকে প্রতিনিয়ত এক চরম অনিশ্চয়তা ও পারমাণবিক আতঙ্কের মধ্যে ডুবিয়ে রাখতো।
পরাশীতল এই যুদ্ধের প্রত্যক্ষ আঁচ অবশ্য হাড়হিম করে দিয়েছিল এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার সদ্য স্বাধীন হওয়া দুর্বল রাষ্ট্রগুলোকে। দুই পরাশক্তি নিজেদের সীমানায় শান্তি বজায় রাখলেও প্রভাব বিস্তারের অদম্য লোভে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে বানালো তাদের রক্তক্ষয়ী দাবা খেলার ঘুঁটি। জন্ম নিলো ‘প্রক্সি ওয়ার’ বা ছায়াযুদ্ধ। ১৯৫০-এর দশকে কোরিয়ান উপদ্বীপে ভাইয়ে-ভাইয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘাত, ১৯৬০ ও ৭০-এর দশকে ভিয়েতনামের ঘন জঙ্গলে মার্কিন বাহিনীর ফেলা নেপাম বোমার নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞ কিংবা পরবর্তীতে আফগানিস্তানের ধূসর পাহাড়ে সোভিয়েত রেড আর্মির ট্যাঙ্ক অভিযান—এসবই ছিল দূর থেকে পরিচালিত ওয়াশিংটন ও মস্কোর ক্ষমতার লড়াই। এশীয় ও আফ্রিকান তরুণদের রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল সেই মাটি, আর তার নেপথ্য কলকাঠি নেড়েছে দুই দূরবর্তী পরাশক্তি।
সময়ের সাথে সাথে এই বৈশ্বিক বিভাজন কেবল আদর্শে আটকে থাকেনি, বরং তা প্রাতিষ্ঠানিক সামরিক রূপ নেয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ছায়াতলে গঠিত হয় সামরিক জোট ‘ন্যাটো’ (NATO), যার জবাবে সোভিয়েত ইউনিয়ন পূর্ব ইউরোপের কমিউনিস্ট রাষ্ট্রগুলোকে নিয়ে গড়ে তোলে ‘ওয়ারশ প্যাক্ট’ (Warsaw Pact)। ইউরোপের বুকের উপর দিয়ে টানিয়ে দেওয়া হয় এক অদৃশ্য ও অপ্রতিরোধ্য সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রাচীর, যাকে উইনস্টন চার্চিল আখ্যা দিয়েছিলেন ‘লৌহ পর্দা’ বা আইরন কার্টেন। রাজনীতির এই বিষাক্ত বাষ্প চূড়ান্ত শিখরে পৌঁছায় ১৯৬২ সালের অক্টোবরে—‘কিউবান মিসাইল ক্রাইসিস’-এর সময়। মার্কিন ফ্লোরিডা উপকূলের অদূরে কিউবায় সোভিয়েত পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনকে কেন্দ্র করে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি এবং সোভিয়েত প্রধান নিকিতা ক্রুশ্চেভ ট্রিগারে আঙুল দিয়ে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যান। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে থমকে থাকা বিশ্ব সেদিন এক পারমাণবিক মহাপ্রলয় থেকে রেহাই পেয়েছিল।
তবে সব অন্ধকারের মাঝেই নতুন আশার আলো জ্বলে ওঠে। পরাশক্তিগুলোর এই বৈশ্বিক জিম্মিদশা থেকে বের হয়ে আসতে এশিয়া ও আফ্রিকার দূরদর্শী নেতারা এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নেন। ভারতের জওহরলাল নেহেরু, মিসরের গামাল আবদেল নাসের, ইন্দোনেশিয়ার সুকর্ণ এবং যুগোশ্লাভিয়ার সামরিক নেতা টিটোর যৌথ উদ্যোগে জন্ম নেয় ‘জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন’ (NAM)। বিশ্বকে পরিষ্কার দুটি বিভক্ত শিবিরে ঠেলে দেওয়ার চক্রান্তকে প্রত্যাখ্যান করে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো নিজেদের স্বাধীন সার্বভৌমত্ব ও নিরপেক্ষতার নীতি ঘোষণা করে। স্নায়ুযুদ্ধ কেবল পরাশক্তিগুলোর সীমানা কিংবা সীমান্ত নির্ধারণ করেনি; বরং মহাকাশ দখলের উন্মাদ প্রতিযোগিতা, আধুনিক পারমাণবিক নিরাপত্তা চুক্তি এবং আজকের যে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্র আমরা দেখছি—তার প্রতিটি ইটের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল সাড়ে চার দশকের এই ছায়াযুদ্ধের ইতিহাসেই।
(আগামীকাল পর্ব ৬-এ থাকছে: সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ও এক-মেরুর বিশ্ব: মার্কিন আধিপত্যের সূচনা)
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more