শয়তানের উপাসনা: যেভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেল স্যাটানিজম
Date: 2026-09-24
প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৬, ১:৩৯ পি.এম
শয়তানের উপাসনা: যেভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেল স্যাটানিজম
অ-অ+
শয়তানের উপাসক:
সমগ্র সৃষ্টিজগতের মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট চরিত্র হলো শয়তান। বহু ধর্মে শয়তানকে মানবজাতির শত্রু হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তারপরও অতি প্রাচীনকাল থেকে কিছু লোক শয়তানকেই দেবতা রূপে উপাসনা করে আসছে।
প্রাচীনকালে গোপনে শয়তানের উপাসনা করা হলেও বর্তমানে প্রকাশ্যে শয়তানবাদের চর্চা করা হচ্ছে। আধুনিককালে শয়তানের উপাসনা কীভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে, সে সম্পর্কে আলোচনা করা হবে বিডিফেস টুয়েন্টিফোরের আজকের আয়োজনে।
শয়তানের উপাসকদের সম্পর্কে আলোচনা করার আগে শয়তানের পরিচয় জানা প্রয়োজন। আরবি ভাষায় শয়তান অর্থ বিপথগামী। হিব্রু ভাষায় "ছতন" এবং ল্যাটিন ভাষায় "সাতান" অর্থ শত্রু বা দুশমন। অনেকের মতে, শয়তান শব্দটি গ্রিক ভাষার "দিয়াবল্স" শব্দ থেকে এসেছে; যার অর্থ অপবাদদানকারী ব্যক্তি বা অভিশপ্ত।
অ্যাব্রাহামিক রিলিজিয়নে শয়তান বলতে সাধারণত ইবলিসকে বোঝায়। ইহুদি ধর্ম, খ্রিস্টান ধর্ম এবং ইসলাম ধর্মকে একত্রে বোঝাতে অ্যাব্রাহামিক রিলিজিয়ন বলা হয়। কারণ এই ধর্মগুলো হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের বংশধরদের মাধ্যমে প্রচারিত হয়েছিল।
বর্তমান বিশ্বের এই প্রধান তিনটি ধর্মে ইবলিসের অস্তিত্ব সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা হয়েছে। ইবলিস হলো দুষ্টু জিন, যে মহান আল্লাহর হুকুম অমান্য করে অভিশপ্ত হয়েছিল। অ্যাব্রাহামিক ধর্মে ইবলিস শয়তানকে বিপথগামী দানব হিসেবে প্রকাশ করা হয়; যে মানুষকে সব সময় খারাপ কাজ করতে অনুপ্রেরণা জোগায়।
পবিত্র কুরআনে ১০০ বার শয়তানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। শয়তান প্রসঙ্গে কুরআনে ১ বার খান্নাস, ১১ বার ইবলিস এবং ৮৮ বার শয়তান নামের উল্লেখ রয়েছে। শয়তানের উপাসনা সম্পর্কে আল-কুরআনে বলা হয়েছে: "হে আদম সন্তান, আমি কি তোমাদেরকে বলে রাখিনি যে শয়তানের ইবাদত করো না? সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।"
পবিত্র কুরআন এবং বাইবেলে শয়তানের প্রতি ভক্তি প্রদর্শন বা শয়তানের প্রশংসা করাকে শয়তানের উপাসনা বোঝানো হয়েছে। ইসলাম ধর্মে শয়তানকে মানুষের প্রধান শত্রু হিসেবে গণ্য করা হয়। পবিত্র কুরআনে শয়তানের শত্রুতা সম্পর্কে বলা হয়েছে: "শয়তান তোমাদের শত্রু, অতএব তাকে শত্রুরূপেই গ্রহণ করো। সে তার অনুসারীদের আহ্বান করে যেন তারা জাহান্নামী হয়।"
বহু প্রাচীনকাল থেকেই পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে শয়তানের উপাসনা চলে আসছে। শয়তানের উপাসকেরা শয়তানকে দেবতা রূপে গ্রহণ করে। শয়তানের উপাসনার উদ্ভব হয়েছিল প্রেতচর্চা, ডাইনি আর অপদেবতার আচার-অনুষ্ঠান থেকে। প্রাচীন মিসরীয় সভ্যতাতেও শয়তানের উপাসনা করা হতো। অধিকাংশ সময়ই বিপথগামী লোকজন গোপনে শয়তানের আরাধনা করতো। সেসব শয়তানের উপাসকেরা সঙ্ঘবদ্ধভাবে প্রকাশ্যে তাদের ধর্মমত প্রচার করতে সক্ষম হয়নি।
আধুনিককালে প্রচলিত শয়তানবাদী ধর্মের মহাগুরু হলো অ্যালিস্টার ক্রাউলি। ছেলেবেলা থেকেই ক্রাউলি খ্রিস্টান ধর্মকে ঘৃণা করতো। সে দাবি করে, ১৯০৪ সালে মিসর ভ্রমণের সময় 'আইওয়াস' নামের এক অপদেবতা তার সাথে সাক্ষাৎ করে। এরপর থেকে অ্যালিস্টার ক্রাউলি নিজেকে শয়তানবাদের নবী মনে করে। অনেকের ধারণা, ক্রাউলি শয়তানকেই প্রতীকীভাবে দেখেছিল।
আইওয়াস নামের সেই অপদেবতার কাছ থেকে প্রাপ্ত নির্দেশনায় অ্যালিস্টার ক্রাউলি একটি বই রচনা করে। বইটির নাম 'দ্য বুক অফ দ্য ল' (The Book of the Law)। এই বইয়ের মূলমন্ত্রই হলো: "যা ইচ্ছে তাই করো, এই হলো পূর্ণাঙ্গ বিধান।" এই মতবাদের উপর ভিত্তি করে অ্যালিস্টার ক্রাউলি 'থেলেমা' (Thelema) নামের নতুন এক ধর্মবিশ্বাস প্রচলন করে।
শয়তানবাদীরা মনে করে, ধর্ম মানুষকে তার নিজস্ব মনোবৃত্তি পালনে বাধা দিচ্ছে। থেলেমা ধর্মমতে অবাধ ও বিকৃত জোনাচার, মাদকের ব্যবহার এবং স্বেচ্ছাচারিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসবের মাধ্যমে নিজের প্রবৃত্তির দাসত্ব করতে হয়। অ্যালিস্টার ক্রাউলির লেখা বই প্রচলিত স্যাটানিজম বা শয়তানবাদের প্রধানতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত এবং অ্যালিস্টার ক্রাউলি হলো আধুনিক স্যাটানিজমের গডফাদার। আধুনিক পপ কালচারেও অ্যালিস্টার ক্রাউলির অনেক প্রভাব রয়েছে।
শয়তানের উপাসকদের মধ্যে সবচেয়ে বড় কিংবদন্তি হলো অ্যান্টন স্যান্ডর ল্যাভি (Anton Szandor LaVey)। তার হাত ধরেই ১৯৬০-এর দশকে শয়তানের উপাসনা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচারিত হতে থাকে। অ্যান্টন ল্যাভি ১৯৬৬ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্যের সান ফ্রান্সিসকো শহরে 'চার্চ অফ স্যাটান' (Church of Satan) বা শয়তানের গির্জা প্রতিষ্ঠা করে। তাকে শয়তান উপাসকদের পোপ হিসেবে তুলনা করা হয়।
চার্চ অফ স্যাটান-ই মূলত আনুষ্ঠানিক স্যাটানিজম বা শয়তানবাদের প্রবর্তক। 'দি স্যাটানিক বাইবেল' (The Satanic Bible) নামে তাদের একটি ধর্মগ্রন্থও রয়েছে। বলাই বাহুল্য, শয়তানের বাইবেলের রচয়িতাও অ্যান্টন ল্যাভি।
অ্যান্টন ল্যাভি শয়তানের উপাসনার উপর আরো বেশ কিছু বই লিখেছে। বইগুলো হলো: 'দ্য স্যাটানিক রিচুয়াল', 'দ্য স্যাটানিক উইচ', 'দ্য ডেভিলস নোটবুক' এবং 'স্যাটান স্পিকস'। শয়তানবাদের এই মহাগুরু শুধু বই লিখেই ক্ষান্ত হয়নি; শয়তানের নামে তার তিনটি সঙ্গীত অ্যালবামও আছে। অ্যালবামগুলো হলো: 'দ্য স্যাটানিক ম্যাথ', 'স্যাটান টেক্স আ হলিডে' এবং 'স্ট্রেঞ্জ মিউজিক'।
১৯৯৭ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত অ্যান্টন ল্যাভি শয়তানের গির্জার মহাযাজক ছিল। ল্যাভির মৃত্যুর পর চার্চ অফ স্যাটানের মহাযাজক পদটি ৪ বছর খালি ছিল। ২০০১ সালে পিটার এইচ গিলমোর (Peter H. Gilmore) এই পদে আসীন হয়। এরপর শয়তানের গির্জার সদর দফতর সান ফ্রান্সিসকো থেকে নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটনের হেলস কিচেনে স্থানান্তর করা হয়।
আধুনিক শয়তানবাদীরা নানা ভাগে বিভক্ত। তাদের মধ্যে প্রধান দুটি ধারা হলো: আস্তিক ও নাস্তিক। আস্তিক শয়তানবাদীরা অহংকার এবং ব্যক্তিবাদের ভিত্তিতে শয়তানকে ইতিবাচক শক্তি বলে মনে করে। অন্যদিকে নাস্তিক শয়তানবাদীরা শয়তানকে মানুষের সকল খারাপ বৈশিষ্ট্যের প্রতীক মনে করে।
শয়তানের গির্জা থেকে ধারণা লাভ করে ২০১৩ সালে 'দি স্যাটানিক টেম্পল' (The Satanic Temple) বা শয়তানের মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়। লুসিয়ান গ্রেভস (Lucien Greaves) ও ম্যালকম জেরি (Malcolm Jarry) শয়তানের মন্দির গড়ে তুলেছে। ম্যালকম জেরি সাধারণত জনসম্মুখে আসে না, লুসিয়ান গ্রেভস শয়তানের মন্দিরের মুখপাত্র হিসেবে কাজ করে।
যুক্তরাষ্ট্রের মাসাচুসেটস রাজ্যের সালেম শহরে স্যাটানিক টেম্পলের সদর দফতর অবস্থিত। বর্তমানে এই মন্দিরের আমেরিকায় ১৬টি, কানাডায় ৩টি এবং যুক্তরাজ্যে ১টি শাখা রয়েছে। বাক স্বাধীনতা এবং ধর্ম পালনের স্বাধীনতা আইনের বলে স্যাটানিক টেম্পল আমেরিকান সরকারের কাছ থেকে ধর্ম হিসেবেও স্বীকৃতি পেয়েছে। শয়তানের উপাসকদের মধ্যে বর্তমানে এরাই সবচেয়ে বেশি সক্রিয়। ২০২০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় আরেকটি স্বতন্ত্র শয়তানের গির্জা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে; পূর্বে আলোচিত গোষ্ঠীগুলোর সাথে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই।
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more