প্রফেসর ডক্টর জামাল নজরুল ইসলাম; যে নক্ষত্রের মূল্যায়ন করতে পারিনি আমরা
Date: 2026-10-01
প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: অক্টোবর ০১, ২০২৬, ৩:৩০ পি.এম
প্রফেসর ডক্টর জামাল নজরুল ইসলাম; যে নক্ষত্রের মূল্যায়ন করতে পারিনি আমরা
অ-অ+
নিজস্ব প্রতিবেদক:
বিশ্ববিজ্ঞানের মানচিত্রে যে কজন মহীয়সী বাঙালি নিজেদের প্রজ্ঞা ও মৌলিক গবেষণার অনন্য স্বাক্ষর রেখে গেছেন, তাঁদের মধ্যে সর্বাগ্রে উচ্চারিত হওয়ার মতো নাম অধ্যাপক জামাল নজরুল ইসলাম। ১৯৩৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ঝিনাইদহে জন্মগ্রহণকারী এই দূরদর্শী বিজ্ঞানীর পৈতৃক নিবাস ছিল চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার জাফরাবাদে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজিয়েট স্কুল এবং করাচির সেন্ট প্যাট্রিকস হাই স্কুলে পড়াশোনা শেষে তিনি কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে গণিতে বিএসসি সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি পাড়ি জমান বিশ্বখ্যাত কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে, যেখানে ট্রিনিটি কলেজ থেকে গণিতে অনার্স ট্রাইপস এবং পরবর্তীকালে তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। মহাবিশ্বের চূড়ান্ত পরিণতি, কৃষ্ণগহ্বর (Black Hole) এবং আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের ওপর তাঁর মৌলিক গবেষণা বিশ্বতত্ত্বের জগতে নতুন পথ দেখায়। ১৯৮২ সালে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি হিসেবে অর্জন করেন বিরল সম্মানসূচক ‘ডি.এসসি’ (Doctor of Science) ডিগ্রি, যা খুব কমসংখ্যক আন্তর্জাতিক মানের গণিতবিদের কপালেই জোটে।
বিজ্ঞানের চূড়ায় আরোহণের এই পথপরিক্রমায় বিশ্বখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফ্র্যাড হোয়েল, নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী আবদুস সালাম, অমর্ত্য সেন, বিশ্বখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং, রজার পেনরোজ এবং ভারতীয় গণিতবিদ জয়ন্ত নার্লিকরের সঙ্গে তাঁর ছিল গভীর সখ্য ও তাত্ত্বিক গবেষণার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অফ অ্যাস্ট্রোনমি, ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি (Caltech), প্রয়োগ গণিত ও সাইদ্ধান্তিক পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ এবং লন্ডনের সিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘ গবেষণার মাধ্যমে তিনি আন্তর্জাতিক সুনাম অর্জন করেন। বিশ্বখ্যাত প্রকাশনী কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস থেকে প্রকাশিত তাঁর রচিত ‘দি আলটিমেট ফেট অব দ্য ইউনিভার্স’ (১৯৮৩), ‘ক্লাসিক্যাল জেনারেল রিলেটিভিটি’ (১৯৮৪), ‘রোটেটিং ফিল্ডস ইন জেনারেল রিলেটিভিটি’ (১৯৮৫) এবং ‘অ্যান ইন্ট্রোডাকশন টু ম্যাথমেটিক্যাল কসমোলজি’ (১৯৯২) বিশ্বজুড়ে পাঠ্য হিসেবে প্রশংসিত হয়। বিশেষ করে মহাবিশ্বের বিলুপ্তি ও সুদূর ভবিষ্যৎ নিয়ে লিখিত তাঁর প্রথম বইটি হিব্রু, ফরাসি, জাপানি ও পর্তুগিজসহ বিশ্বের বহু ভাষায় অনূদিত হয়ে এক দুর্লভ ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সংকটকালে এই মহাবিজ্ঞানী আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে মাতৃভূমির প্রতি এক অতুলনীয় রাজনৈতিক ও নৈতিক দায়বদ্ধতার পরিচয় দিয়ে নিজেকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত থাকাকালে বাংলাদেশে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গণহত্যা ও নারকীয় তাণ্ডব বন্ধ করতে তিনি তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হ্যারল্ড উইলসনের কাছে সরাসরি চিঠি পাঠিয়ে কূটনৈতিক হস্তক্ষেপ ও হামলা বন্ধের আবেদন জানান। শুধু চিঠি লিখেই ক্ষান্ত না হয়ে বন্ধু জয়ন্ত নার্লিকর ও অন্যান্য সহযোদ্ধাদের সাথে নিয়ে তিনি প্রবাসে বাংলাদেশ মুক্তি সংগ্রাম পরিষদ গঠনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। নিজের পকেটের অর্থ এবং প্রবাসীদের কাছ থেকে অর্জিত তহবিল সংগ্রহ করে তিনি মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে বিশ্ব জনমত গঠনে নিরলস কাজ করে যান, যা একজন বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞানীর প্রগাঢ় দেশপ্রেমেরই চরম স্মারক।
কিন্তু এই নিঃশ্বার্থ দেশপ্রেমের চূড়ান্ত পরাকাষ্ঠা দৃশ্যমান হয় ১৯৮৪ সালে, যখন বিদেশে অঢেল অর্থ, রাজকীয় সুযোগ-সুবিধা, সর্বোচ্চ বৈজ্ঞানিক সম্মাননা এবং বিশ্বমানের গবেষণাগারের আধুনিক জীবন ত্যাগ করে তিনি স্থায়ীভাবে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান মহলের শত বারণ ও বিস্ময়কে উপেক্ষা করে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে তৎকালীন মাত্র তিন হাজার টাকা স্কেলের বেতনে গণিত বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। দেশের মাটিতে বিশ্বমানের মৌলিক গবেষণা নিশ্চিত করতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন 'রিসার্চ সেন্টার ফর ম্যাথমেটিক্যাল অ্যান্ড ফিজিক্যাল সায়েন্সেস' (RCMPS)। তিনি বিশ্বাস করতেন, সদিচ্ছা ও তীক্ষ্ণ মেধা থাকলে নিজস্ব সীমিত সম্পদ দিয়েও বিশ্বমঞ্চে গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের নতুন ব্যাখ্যা তৈরি করা সম্ভব। সেই লক্ষ্যে তিনি ব্যক্তিগত প্রভাবে স্টিফেন হকিং ও আবদুস সালামের মতো বিজ্ঞানের মহারথীদের বাংলাদেশে আমন্ত্রণ জানিয়ে এনে আন্তর্জাতিক সেমিনারের আয়োজন করতেন এবং নিজস্ব অর্জিত অর্থ দিয়ে শিক্ষার্থীদের গবেষণা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি সমৃদ্ধ করতেন। কম্পিউটার কিংবা ডিজিটাল প্রযুক্তির চেয়ে কাগজ-কলম আর পুরোনো টাইপরাইটারে জটিল গাণিতিক সমীকরণ সমাধানে অভ্যস্ত এই নির্লোভ সাধক আমৃত্যু দেশের নতুন প্রজন্মকে বিজ্ঞানের প্রেমে উদ্বুদ্ধ করে গেছেন।
অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, নিজ জন্মভূমিতে জামাল নজরুল ইসলাম কখনোই সেই সম্মান, মর্যাদা বা উপযুক্ত মূল্যায়ন পাননি, যা তাঁর আন্তর্জাতিক খ্যাতি, অনন্য মেধা এবং দেশপ্রেমের বিচারে শতভাগ প্রাপ্য ছিল। যে মহান স্বপ্ন ও জাতীয় আকাক্সক্ষা নিয়ে তিনি বিদেশের সুবর্ণ ক্যারিয়ার বিসর্জন দিয়ে দেশে ফিরেছিলেন, এদেশের রুগ্ণ রাজনৈতিক সদিচ্ছা, জাতীয় উদাসীনতা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা তাঁর সেই স্বপ্নকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে দেয়। তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিশ্বমানের গবেষণা কেন্দ্রটি প্রয়োজনীয় অর্থায়ন, উপযুক্ত সুযোগ-সুবিধা এবং প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকতার চরম অভাবে দিনে দিনে তার কার্যকারিতা হারাতে থাকে। দেশের সার্বিক শিক্ষাব্যবস্থা ও বিজ্ঞানের নীতিনির্ধারণে তাঁকে কোনো কার্যকর নেতৃত্ব দিতে না দেওয়া আমাদের জাতীয় দূরদর্শিতার অভাবকেই নগ্নভাবে ফুটিয়ে তোলে।
জীবদ্দশায় তিনি ২০০১ সালে একুশে পদক এবং ২০১১ সালে স্বাধীনতা পুরস্কারের মতো রাষ্ট্রীয় সম্মাননা পেলেও, বিশ্ববিজ্ঞানে তাঁর অবদানের তুলনায় সেই আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতিগুলো ছিল নিতান্তই অপ্রতুল ও নামমাত্র। একজন বিশ্বমানের বিজ্ঞানীকে জাতীয় সম্পদে পরিণত করার বদলে আমরা তাঁকে রেখেছিলাম অবহেলা, অপমূল্যায়ন ও নির্জন বিস্মৃতির অন্তরালে। ২০১৩ সালের ১৬ মার্চ চট্টগ্রাম শহরের একটি হাসপাতালে এই কালজয়ী মহাবিজ্ঞানী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর পর আনুষ্ঠানিক শোকবার্তা কিংবা লোকদেখানো স্মৃতিরক্ষার বাইরে তাঁর রেখে যাওয়া মূল্যবান বৈজ্ঞানিক দর্শন ও গবেষণা ধারাকে বাঁচিয়ে রাখার মতো কোনো প্রাতিষ্ঠানিক টেকসই পদক্ষেপ রাষ্ট্র গ্রহণ করেনি। অধ্যাপক জামাল নজরুল ইসলামের এই করুণ অবমূল্যায়ন মূলত আমাদের বিজ্ঞানবিমুখ মানসিকতা ও চরম মেধা-অমূল্যায়নের এক ঐতিহাসিক দলিল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, যা আধুনিক বাংলাদেশের অন্যতম বড় ব্যর্থতা।
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more