বিশ্বরাজনীতি (পর্ব ২৫): আন্তঃসীমান্ত নদী ও জল সংকটের ভবিষ্যৎ সংঘাত
অক্টোবর ২৫, ২০২৬, ৫:৪০ এ.এম
প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: অক্টোবর ২৫, ২০২৬, ৫:৪০ এ.এম
বিশ্বরাজনীতি (পর্ব ২৫): আন্তঃসীমান্ত নদী ও জল সংকটের ভবিষ্যৎ সংঘাত
অ-অ+
বিশেষ সিরিজ | বিশ্ব শাসনের ইতিহাস:
মানব সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই নদীর তীরবর্তী উর্বর অববাহিকায় গড়ে উঠেছে মানব জনপদ ও সাম্রাজ্য। প্রাচীন সুমেরীয়, সিন্ধু, মিশরীয় কিংবা মেসোপটেমীয় সভ্যতার বিকাশ ঘটেছিল নদীর হাত ধরেই। তবে একবিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক বাস্তবতায় এসে সেই জীবনদায়ী পানিই এখন বিশ্বরাজনীতির সবচেয়ে সংবেদনশীল ও বিস্ফোরক সম্পদে পরিণত হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন, দ্রুত বর্ধমান জনমিতি, অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং শিল্পায়নের ফলে বিশ্বজুড়ে মিঠা পানির তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে বয়ে চলা আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং জলসম্পদের একচ্ছত্র অধিকার নিয়ে পরাশক্তি থেকে শুরু করে আঞ্চলিক প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার প্রচ্ছন্ন উত্তেজনা এখন চরম রূপ ধারণ করেছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষকরা তাই সতর্ক করে বলছেন যে, ভবিষ্যতের বিশ্বযুদ্ধ তেল বা গ্যাসের জন্য নয়, বরং পানির জন্য সংঘটিত হওয়ার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি।
পৃথিবীর অর্ধেকেরও বেশি জনসংখ্যা জীবনধারণের জন্য আন্তঃসীমান্ত নদী অববাহিকাগুলোর ওপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল। কিন্তু সমস্যা হলো, অনেক প্রধান নদীর উৎপত্তিস্থল বা ঊর্ধ্বপ্রবাহ একটি দেশের ভূখণ্ডে হলেও তার নিচের অংশ প্রবাহিত হয়েছে অন্য দেশগুলোর ওপর দিয়ে। এই ভৌগোলিক সুবিধাটিকে কাজে লাগিয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো ঊর্ধ্বপ্রবাহে বিশাল সব বাঁধ নির্মাণ, জলাধার তৈরি এবং নদীর স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তন বা একতরফা পানি প্রত্যাহারের মতো কৌশল গ্রহণ করছে। এর ফলে নিম্নপ্রবাহের দেশগুলোতে দেখা দিচ্ছে ভয়াবহ খরা, কৃষি জমির মরুকরণ এবং পানীয় জলের মারাত্মক সংকট। আন্তঃসীমান্ত নদীর পানি ব্যবস্থাপনা ও বণ্টন নিয়ে আন্তর্জাতিক আইন বা কার্যকর সমঝোতার অভাব এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। নদীকে রাজনৈতিক বা সামরিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের এই প্রবণতাই বর্তমান বিশ্বের নতুন ‘হাইড্রোলজিক্যাল পলিটিক্স’ বা পানির ভূ-রাজনীতি।
পানির এই ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার সবচেয়ে জ্বলন্ত উদাহরণগুলোর দেখা মেলে এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের ভূখণ্ডে। চীনের তিব্বত মালভূমি থেকে উৎপন্ন হয়ে মেকং, ব্রহ্মপুত্র বা ইয়াংসিকের মতো প্রমত্তা নদীগুলো এশিয়ার জনবহুল দেশগুলোর ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। চীন তার সীমানার ভেতরে মেকং ও ব্রহ্মপুত্রের ওপর একাধিক বিশাল মেগা-ড্যাম বা জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ করায় ভাটির দেশগুলো—যেমন ভারত, বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার জলবায়ু ও কৃষি অর্থনীতি চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। ঠিক একইভাবে, টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর ওপর তুরস্কের উচ্চাভিলাষী ‘গ্যাপ’ (GAP) প্রকল্পের কারণে সিরিয়া ও ইরাকের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে মরুকরণ ও পানির হাহাকার দেখা দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের খরগোটে মরুভূমির মধ্যে জর্ডান নদী ও নীল নদের অববাহিকায় মিশর, সুদান এবং ইথিওপিয়ার মধ্যকার ‘গ্র্যান্ড ইথিওপিয়ান রেনেসাঁ ড্যাম’ নিয়ে চলা দ্বন্দ্ব যেকোনো মুহূর্তে সামরিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
পানির এই সংকটের আরেকটি নির্মম দিক হলো ‘জলবায়ু অভিবাসী’ ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা। নদী শুকিয়ে যাওয়া, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর তীব্রভাবে নিচে নেমে যাওয়া এবং লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে লাখ লাখ মানুষ তাদের পৈতৃক ভিটেমাটি ও জীবিকা হারাতে বাধ্য হচ্ছে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়া এবং সাব-সাহারান আফ্রিকায় এই জলবায়ু সংকট রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অভ্যন্তরীণ সংঘাতে উসকানি দিচ্ছে। নদীমাতৃক দেশগুলোতে পানির ন্যায্য হিস্যা না পাওয়ার কারণে কৃষিনির্ভর অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, যা পরোক্ষভাবে খাদ্য নিরাপত্তাকেও তীব্র সংকটের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার যখন পানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন কূটনীতি ব্যর্থ হয়ে কূটকৌশল ও বলপ্রয়োগের পথ বেছে নেয়।
পানির ভূ-রাজনীতি তাই কেবল পরিবেশগত বা নদী ব্যবস্থাপনার প্রযুক্তিগত কোনো সমস্যা নয়; এটি আগামী দিনের মানব সভ্যতার অস্তিত্ব রক্ষার এক চরম লড়াই। আন্তর্জাতিক আইন ও ন্যায্য হিস্যার নীতি লঙ্ঘন করে কোনো একটি রাষ্ট্র যদি নদীর ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে চায়, তবে তা গোটা অঞ্চলের শান্তি ও নিরাপত্তাকে চিরতরে ধ্বংস করে দিতে পারে। একবিংশ শতাব্দীর পরিবর্তিত বিশ্বে যে রাষ্ট্র বা অঞ্চল এই জল সংকট বুদ্ধিমত্তার সাথে মোকাবিলা করতে পারবে এবং আন্তঃসীমান্ত নদীর ন্যায্য ব্যবস্থাপনার পথ উন্মুক্ত করবে, তারাই টিকে থাকবে ভবিষ্যতের টেকসই পরাশক্তি হিসেবে।
(আগামীকাল ২৬শে অক্টোবর, ছাব্বিশতম পর্বে থাকছে: আর্কটিক অঞ্চলের বরফ গলন ও নতুন জলপথের লড়াই: মেরু ভূ-রাজনীতির রুদ্ধশ্বাস প্রতিযোগিতা)
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more