বিশ্বরাজনীতি (পর্ব ২২): মহাকাশ প্রতিযোগিতা ও স্যাটেলাইট কূটনীতি: মহাকাশের নতুন সামরিকীকরণ
অক্টোবর ২২, ২০২৬, ৫:১৩ এ.এম
প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: অক্টোবর ২২, ২০২৬, ৫:১৩ এ.এম
বিশ্বরাজনীতি (পর্ব ২২): মহাকাশ প্রতিযোগিতা ও স্যাটেলাইট কূটনীতি: মহাকাশের নতুন সামরিকীকরণ
অ-অ+
বিশেষ সিরিজ | বিশ্ব শাসনের ইতিহাস:
স্নায়যুদ্ধকালীন সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে মহাকাশ দখলের লড়াই শুরু হয়েছিল মূলত বৈজ্ঞানিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা এবং নিজ নিজ মহাদর্শের সামর্থ্য প্রদর্শনের হাতিয়ার হিসেবে। তবে একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে এসে মহাকাশ রাজনীতি আর কেবল বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান কিংবা চন্দ্রাভিযানের মতো জাতীয় গর্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আধুনিক ভূ-রাজনীতিতে মহাকাশ এখন অর্থনৈতিক ও কৌশলগত ক্ষমতার এক নতুন যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের সীমানা ছাড়িয়ে হাজার হাজার কিলোমিটার উপরের কক্ষপথ আজ হয়ে উঠেছে সামরিক নজরদারি, বৈশ্বিক যোগাযোগ, তথ্য সংগ্রহ এবং ভূ-রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্রবিন্দু। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতির সাথে সাথে মহাকাশের এই রূপান্তর বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যকে এক নতুন ও চরম বিপজ্জনক মোড়ে এনে দাঁড় করিয়েছে।
মহাকাশের সামরিকীকরণের এই নতুন দৌড়ে সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলেছে আধুনিক স্যাটেলাইট বা কৃত্রিম উপগ্রহ প্রযুক্তি। পৃথিবীর কক্ষপথে ঘুরতে থাকা হাজার হাজার সামরিক ও বাণিজ্যিক উপগ্রহ বর্তমানে আধুনিক যুদ্ধকৌশল ও সার্বভৌম নিরাপত্তার মূল চালিকাশক্তি। হাই-রেজোলিউশন রিমোট সেন্সিং স্যাটেলাইট, গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম (GPS) এবং অতি-সংবেদনশীল রাডার ব্যবস্থা ভূমিতে সেনাদলের অবস্থান পর্যবেক্ষণ থেকে শুরু করে নির্ভুল লক্ষ্যমাত্রায় ক্ষেপণাস্ত্র পরিচালনায় মুখ্য ভূমিকা পালন করছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সংঘাতে ভূ-উপগ্রহের ডেটা যেভাবে যুদ্ধক্ষেত্রের গতিপথ বদলে দিয়েছে, তা বিশ্বজুড়ে সামরিক কৌশলবিদদের চোখ খুলে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ইন্টারনেট নেটওয়ার্কের ওপর উপগ্রহগুলোর নিয়ন্ত্রণ এখন যেকোনো দেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
এই কৌশলগত প্রয়োজনীয়তা থেকেই জন্ম নিয়েছে 'অ্যান্টি-স্যাটেলাইট' (ASAT) প্রযুক্তির দৌড় এবং স্থানভিত্তিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন এবং ভারত ইতোমধ্যে সফলভাবে অ্যান্টি-স্যাটেলাইট মিসাইল পরীক্ষা করে প্রমাণ করেছে যে তারা শত্রুপক্ষের কক্ষপথীয় সম্পদ ধ্বংস করতে সক্ষম। স্যাটেলাইট ধ্বংসের এই ক্ষমতা কেবল যুদ্ধের সময় প্রতিপক্ষের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে অচল করে দেওয়ার হাতিয়ারই নয়, বরং কূটনৈতিক টেবিলে এক বিরাট মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা বা ‘ডিটারেন্স’ হিসেবে কাজ করছে। একই সাথে মহাকাশে পরিচালিত সাইবার আক্রমণ, স্যাটেলাইটের সংকেত জ্যাম করে দেওয়া এবং লেজার রশ্মির মাধ্যমে উপগ্রহের অপটিক্যাল সেন্সর অকেজো করার মতো অদৃশ্য যুদ্ধকৌশল আজ নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। ভূ-রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের এই আকাঙ্ক্ষা মহাকাশকে এক চরম অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে পরিণত করছে।
মহাকাশের এই নতুন প্রতিযোগিতায় 'স্যাটেলাইট কূটনীতি' (Satellite Diplomacy) পরাশক্তিগুলোর বিশ্বব্যাপী প্রভাব বিস্তারের এক কার্যকর মাধ্যমে রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উন্নয়নশীল ও উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোতে নিজস্ব স্যাটেলাইট প্রযুক্তি, যোগাযোগ কাঠামো এবং জিপিএস বা নেভিগেশন নেটওয়ার্ক সরবরাহের মাধ্যমে ভূ-রাজনৈতিক মিত্রতার পরিধি বাড়াচ্ছে। চীনের ‘বেইদউ’ (Beidou) নেভিগেশন সিস্টেম কিংবা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘জিপিএস’ এবং বেসরকারি বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট হাবগুলো বিশ্বব্যাপী তথ্যপ্রবাহের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখার প্রতিযোগিতা করছে। যে রাষ্ট্রগুলো মহাকাশে নিজেদের সম্পদ পাঠাতে সক্ষম নয়, তারা সরাসরি পরাশক্তিগুলোর ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছে, যা প্রকারান্তরে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে পরাশক্তিগুলোর প্রতি তাদের রাজনৈতিক আনুগত্য বৃদ্ধি করছে।
মহাকাশের বাণিজ্যিকীকরণ এবং নতুন আন্তর্জাতিক আইনের অভাব এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি মহাকাশ শিল্প, যেমন ইলন মাস্কের স্পেসএক্স (SpaceX)-এর স্টারলিঙ্ক কিংবা অন্যান্য বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা বৈশ্বিক নিরাপত্তায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। উপগ্রহের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় কক্ষপথে স্থানের সংকট ও মহাকাশ বর্জ্য (Space Debris) বৃদ্ধির বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ১৯৬৭ সালের ঐতিহাসিক 'আউটার স্পেস ট্রিটি' (Outer Space Treaty) আধুনিক স্যাটেলাইট যুদ্ধকৌশল ও মহাকাশের সামরিকীকরণ রোধে পুরোপুরি ব্যর্থ হচ্ছে। বর্তমান বহু-মেরুভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থায় মহাকাশের ওপর আধিপত্য বিস্তারই এখন পৃথিবীর রাজনৈতিক প্রভাব নির্ধারণের অন্যতম শর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে রাষ্ট্র মহাকাশের কক্ষপথ ও উপগ্রহের তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করবে, একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বরাজনীতিতে চরম ক্ষমতার লাগাম মূলত তারই হাতে থাকবে।
(আগামীকাল ২৩শে অক্টোবর, তেইশতম পর্বে থাকছে: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার যুদ্ধ ও তথ্যের ভূ-রাজনীতি: প্রযুক্তির নতুন সাম্রাজ্যবাদ)
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more