বাউফল (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি: পটুয়াখালীর বাউফল পৌরসভার
প্রকৌশলী মো. আতিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে ভবন নির্মাণের নকশা অনুমোদনের নামে অতিরিক্ত
অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘদিন একই উপজেলায় কর্মরত থাকা এই প্রকৌশলীর অপসারণের
দাবি তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। জানা গেছে, মো. আতিকুল ইসলাম
২০০১ সালে চাকরিতে যোগ দেন। চাকরিজীবনের প্রায় ২৫ বছরের মধ্যে প্রায় ১৮ বছরই তিনি বাউফল
পৌরসভায় কর্মরত রয়েছেন। পৌরসভার বিল্ডিং প্ল্যান অনুমোদনের দায়িত্ব তার দপ্তরের অধীনে।
তবে অভিযোগ রয়েছে, বাইরে কোনো স্থপতি বা প্রকৌশলীর তৈরি নকশা সহজে অনুমোদন দেওয়া হয়
না। অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকদের বাধ্য করা হয় তার মাধ্যমে নকশা করাতে। অন্যথায় প্ল্যান
অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি করা হয়। পৌরসভার নিয়ম অনুযায়ী ভবন
নির্মাণের আবেদন ফি ১ হাজার টাকা। এছাড়া ৫০০ বর্গফুট আয়তনের একতলা ভবনের জন্য ২ হাজার
টাকা এবং পরবর্তী প্রতি বর্গফুটের জন্য ২ টাকা করে সরকারি ফি নির্ধারিত রয়েছে। কিন্তু
অভিযোগ রয়েছে, বাস্তবে গ্রাহকদের কাছ থেকে দ্বিগুণ-তিনগুণ এমনকি তার চেয়েও বেশি টাকা
আদায় করা হচ্ছে। নিয়ম অনুযায়ী প্রতি তিন
মাস অন্তর বিল্ডিং প্ল্যানিং কমিটির সভা হওয়ার কথা থাকলেও ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে
দীর্ঘ সময় কোনো সভা অনুষ্ঠিত হয়নি। ওই সময়ের পর প্রায় দেড় বছরে মাত্র দুটি সভা হয়েছে
বলে জানা গেছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, বিভিন্ন
কারণে বর্তমানে পৌরসভার প্রকৌশলীর কাছে প্রায় ২৫ থেকে ৩০টি প্ল্যান অনুমোদনের অপেক্ষায়
রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ভবন নির্মাণের নকশা বাধ্যতামূলক হওয়ায় এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে
ভবন মালিকদের কাছ থেকে নানা অজুহাতে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং
কোড (বিএনবিসি) অনুযায়ী, যে প্রকৌশলী ডিজাইন করবেন তাকেই সংশ্লিষ্ট নির্মাণকাজ তদারকি
করার অঙ্গীকারনামা দিতে হয়। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, কাগজে-কলমে প্রকৌশলীদের নাম থাকলেও
বাস্তবে তারা কখনও বাউফলে এসে কাজ তদারকি করেননি। মুঠোফোনে কথা হলে প্রকৌশলী
মো. ফয়েজউল্লাহ জানান, ইঞ্জিনিয়ার আতিকুল ইসলাম তার মাধ্যমে নকশার কাজ করিয়ে নেন। তবে
নির্মাণকাজের তদারকিতে তারা কখনও বাউফলে যাননি। অন্যদিকে ইঞ্জিনিয়ার নাঈম
বলেন, আগে তিনি আতিকুল ইসলামের কিছু কাজ করতেন। বর্তমানে তিনি ভাণ্ডারিয়া পৌরসভায় কর্মরত।
তিনি জানান, বাউফলে গিয়ে কোনো নির্মাণকাজ তদারকি করেননি। পটুয়াখালীর আরেক প্রকৌশলী
সঞ্জয় জানান, তাকে দিয়ে নামমাত্র পারিশ্রমিকে নকশা ডিজাইন করানো হতো। আতিকুল ইসলাম
তাকে বলতেন, বাউফল পৌরসভার নাগরিকদের জন্য তিনি বিনামূল্যে নকশা করেন, তাই তাকে খুব
কম পারিশ্রমিক দেওয়া হতো। বাউফল উপজেলা ভিত্তিক স্থপতি
মো. শফিকুর রহমান বলেন, “ইঞ্জিনিয়ার আতিকের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো সত্য। আমি নিজেও
একজন প্রকৌশলী। আমাদের করা নকশা অনুমোদন দেওয়া হয় না। এ বিষয়ে আমি আগে পৌর প্রশাসকের
কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছিলাম। পরে প্রশাসক আমাদের নিয়ে বৈঠক করে নকশা অনুমোদনের নির্দেশ
দিলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি।” ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, অনেকেই
প্ল্যান অনুমোদনের জন্য কয়েক মাস থেকে এক বছরের বেশি সময় ধরে অপেক্ষা করছেন। পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের
বাসিন্দা আল আমিন বলেন, “২০২৪ সালের ৫ আগস্টের তিন মাস আগে প্ল্যান অনুমোদনের জন্য
আবেদন করি। এখনও অনুমোদন পাইনি। বিভিন্ন ধাপে আমার কাছ থেকে ৬০ হাজার টাকার বেশি নেওয়া
হয়েছে।” ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা
সোহাগ জানান, চলতি বছরের ডিসেম্বর মাসে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিলেও এখনো প্ল্যান
অনুমোদন পাননি। তার কাছ থেকেও প্রায় ২৬ থেকে ২৮ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পৌরসভার
৮ নম্বর ওয়ার্ডের এক সরকারি কর্মকর্তা বলেন, তার কাছ থেকে নকশা অনুমোদনের জন্য ২৩ হাজার
টাকা নেওয়া হয়েছে। এক বছর পার হলেও এখনও অনুমোদন মেলেনি। ২ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা
তাসলিমা বেগম বলেন, “বাইরের একজন ইঞ্জিনিয়ার দিয়ে নকশা করিয়েছি। প্রায় ছয় মাস হয়ে গেছে,
এখনও অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে না। নির্মাণকাজ শুরু করতে না পেরে মালামাল নষ্ট হচ্ছে।” একই ওয়ার্ডের বাসিন্দা মো.
ফয়সাল জানান, ২০২২ সালের অক্টোবরে বিল্ডিং প্ল্যান ও সয়েল টেস্টের কথা বলে তার কাছ
থেকে ৮০ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে। এখনও প্ল্যান অনুমোদন হয়নি এবং সম্প্রতি আবারও নতুন
করে টাকা দাবি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। অন্যদিকে ২ নম্বর ওয়ার্ডের
বাসিন্দা মো. আনিক জানান, নিজের জমিতে বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণের জন্য তার কাছ থেকে
১৭ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে। এক বছরের বেশি সময় পার হলেও এখনও কোনো অনুমোদন দেওয়া হয়নি। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার
করেছেন অভিযুক্ত প্রকৌশলী মো. আতিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, “আমি কোনো অনিয়মের সঙ্গে জড়িত
নই। জানুয়ারি পর্যন্ত কোনো প্ল্যানও পেন্ডিং নেই। প্ল্যান সংক্রান্ত এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন।” এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের
ডেপুটি ডিরেক্টর (ডিডিএলজি) জুয়েল রানা বলেন, “পৌর প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ করলে
বিষয়টি তদন্ত করা হবে। এর আগে আমরা তদন্ত করে তার বিরুদ্ধে কোনো অনিয়ম পাইনি।” একই
উপজেলায় দীর্ঘদিন কর্মরত থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, এটি মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের বিষয়।
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more