এপস্টেইন বৈশ্বিক কেলেঙ্কারি, ক্ষমতা হারাতে পারেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী

Date: 2026-02-05
news-banner

অনলাইন ডেক্স:

কুখ্যাত এপস্টেইন কেলেঙ্কারির অভিঘাত এখন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে নাড়িয়ে দিয়েছে। এপস্টেইন-ঘিরে তৈরি হওয়া এই সংকট স্টারমারের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখাকে গুরুতর ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। একের পর এক বিতর্কে ডাউনিং স্ট্রিটে তার অবস্থান ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে।

যুক্তরাজ্যে যখন রাজনৈতিক অস্থিরতা ঘনীভূত, তখন যুক্তরাষ্ট্রে এপস্টেইনের ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচারের দাবিতে সরকারের নিষ্ক্রিয়তার বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এই বৈপরীত্য ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক শক্ত অবস্থান এবং স্টারমারের কাঠামোগত দুর্বলতার পার্থক্যকে স্পষ্ট করে তুলেছে।

যুক্তরাজ্যে জবাবদিহি ও তদন্তপ্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে বেশি সক্রিয়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে বিচার বিভাগে ট্রাম্পের প্রভাব এবং রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেস তাকে কঠোর রাজনৈতিক পরিণতি থেকে অনেকটাই রক্ষা করছে।

এপস্টেইন কেলেঙ্কারির প্রভাব যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রেই সীমাবদ্ধ নেই। নরওয়ে থেকে পোল্যান্ড পর্যন্ত এই নথির ছায়া ছড়িয়ে পড়েছে, যা ইঙ্গিত দিচ্ছে-এটি একটি বৈশ্বিক কেলেঙ্কারি। স্টারমার ছাড়াও বহু প্রভাবশালী ব্যক্তি এই বিতর্কের উত্তাপে পড়েছেন।

যুক্তরাজ্যে জনরোষের মাত্রা এতটাই তীব্র যে রাজা তৃতীয় চার্লস তার ভাই সাবেক প্রিন্স অ্যান্ড্রুকে রাজকীয় উপাধি থেকে বঞ্চিত করেছেন এবং উইন্ডসর ক্যাসেলের একটি বাসভবন থেকেও তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রিন্স অ্যান্ড্রু ছিলেন এপস্টেইনের ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের একজন।

যুক্তরাষ্ট্রে তদন্তকারীরা জানিয়েছে, ২০১৯ সালে বিচার শুরুর আগেই কারাগারে এপস্টেইনের মৃত্যু আত্মহত্যা ছিল। তবে সেখানে এমন নজির খুব একটা নেই, যেখানে এপস্টেইনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কারণে কেউ বড় রাজনৈতিক মূল্য দিয়েছেন।

এপস্টেইনের সঙ্গে সম্পর্কের জেরে বড় প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়েন সাবেক মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রেসিডেন্ট ল্যারি সামার্স। গত বছর তিনি জনসম্মুখের কর্মকাণ্ড থেকে সরে দাঁড়ান, কারণ এপস্টেইনের সঙ্গে তার ইমেইল প্রকাশ পায়। সেখানে নারীবিদ্বেষী মন্তব্য ও ব্যক্তিগত সম্পর্কবিষয়ক আলোচনার বিষয় উঠে আসে। সামার্স এ ঘটনায় গভীর লজ্জা প্রকাশ করেন।

ডোনাল্ড ট্রাম্প এই বিতর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে সচেষ্ট। বিচার বিভাগ জানিয়েছে, নতুন কোনো মামলা করা হবে না। ট্রাম্প বা নথিতে নাম থাকা অন্যদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ গঠন করা হয়নি। যদিও নথিতে যাচাই না হওয়া যৌন নিপীড়নের অভিযোগ এবং ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতার বিবরণ রয়েছে। ট্রাম্প সিএনএনকে বলেন, দেশের এখন সামনে এগিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে।

সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বিপাকে পড়েছেন কিয়ার স্টারমার। বৃহস্পতিবার সকালে তার প্রধানমন্ত্রীত্ব কার্যত টালমাটাল হয়ে পড়ে। লেবার পার্টির ভেতরে বিদ্রোহী এমপিদের অবস্থান ডাউনিং স্ট্রিটকে আরও চাপের মুখে ফেলে।

সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে স্টারমার স্বীকার করেন, সাবেক মন্ত্রী পিটার ম্যান্ডেলসনের সঙ্গে জেফরি এপস্টেইনের বন্ধুত্বের কথা তিনি জানতেন, তবু তাকে ওয়াশিংটনে রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন।

প্রকাশিত নথি অনুযায়ী, ২০০৮ সালে ফ্লোরিডায় যৌন অপরাধে দণ্ডিত হওয়ার পরও ম্যান্ডেলসন এপস্টেইনের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। পরবর্তীতে স্টারমার তাকে বরখাস্ত করেন। নতুন নথিতে আরও ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে, বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের সময় ম্যান্ডেলসন গোপন সরকারি তথ্য এপস্টেইনের কাছে সরবরাহ করে থাকতে পারেন-যা তার ওয়াল স্ট্রিট যোগাযোগের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান ছিল। বর্তমানে তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি তদন্ত চলছে। তিনি হাউস অব লর্ডস ও লেবার পার্টি থেকে পদত্যাগ করেছেন। সংসদে স্টারমার বলেন, পিটার ম্যান্ডেলসন দেশ, সংসদ এবং লেবার পার্টির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। বিবিসিকে দেওয়া এক বিবৃতিতে ম্যান্ডেলসন এপস্টেইনের সঙ্গে সম্পর্কের জন্য ক্ষমা চান এবং বলেন, দণ্ডিত হওয়ার পরও তাকে বিশ্বাস করা ছিল গুরুতর ভুল। তিনি ভুক্তভোগী নারী ও কিশোরীদের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং দলকে আরও বিব্রত হওয়া থেকে বাঁচাতেই লেবার পার্টি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানান।

ভূমিধস বিজয়ের মাধ্যমে ক্ষমতায় এলেও দুই বছরের কম সময়ে স্টারমার এখন রাজনৈতিকভাবে প্রায় কোণঠাসা। সংসদে তার সাম্প্রতিক বিব্রতকর উপস্থিতি তাকে দুর্বল নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করেছে এবং লেবার পার্টির ভেতরে নেতৃত্ব পরিবর্তনের গুঞ্জন জোরালো হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্টরা নির্দিষ্ট মেয়াদে ক্ষমতায় থাকলেও ব্রিটেনে প্রধানমন্ত্রী পদে বসার পর থেকেই শুরু হয়-তিনি কতদিন টিকবেন সেই হিসাব। গত ১১ বছরে যুক্তরাজ্যে পাঁচজন প্রধানমন্ত্রী বদলেছে, যা একসময় স্থিতিশীলতার প্রতীক দেশটিকে গভীর রাজনৈতিক অস্থিরতায় ঠেলে দিয়েছে।

এপস্টেইন কাহিনি শেষ পর্যন্ত যুক্ত হয়েছে পিটার ম্যান্ডেলসনের দীর্ঘ রাজনৈতিক ট্র‍্যাজেডির সঙ্গে। ‘প্রিন্স অব ডার্কনেস’ নামে পরিচিত এই প্রতিভাবান কিন্তু বিতর্কিত রাজনীতিবিদ বারবার নিজের সিদ্ধান্তের কারণেই পতনের মুখে পড়েছেন। ধনী ও প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ার আকাঙ্ক্ষাই শেষ পর্যন্ত তাকে এপস্টেইনের মতো এক কুখ্যাত চরিত্রের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলে।

বিশ্লেষকদের মতে, ব্রিটেনে যে রাজনৈতিক ঝড় বইছে, তা শুধু এপস্টেইনের যৌন পাচার কেলেঙ্কারির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি একই সঙ্গে ব্রিটিশ রাজনীতি, গণমাধ্যম ও জনজীবনে চলমান একাধিক সংকটকে আরও তীব্র করে তুলেছে।

 

সূত্র-সিএনএন/বিডিনিউজ

বিডিফেস/এম ডিউক

Leave Your Comments